বাণী কনিকা

আশীর্ব্বাণী
১০৭.

যুদ্ধের দামামা স্তব্ধ হয়েছে । চারিদিকে শুধু শান্তির বাণী । রণক্লান্ত মানুষ সুখ নীড়ের আশায় পথ চেয়ে আছে । নতুন দিন নতুন জীবন ! অনেক দিনের স্বপ্ন সফল হতে চলেছে ।

এই আনন্দের দিনে মন থেকে দুর্বলতা দূর কর । মনে সাহস সঞ্চার কর । তোমার সকল ভার আমার চরণে অর্পণ কর । তুমি আমিত্ববোধ মুক্ত হও । শুভ আবির্ভাব দিবসে ভক্তি – বিনম্র চিত্তে বল – “জয় ব্রজানন্দ হরে ।”

নির্ভরশীলতাই প্রকৃত ভক্তের লক্ষণ । সরল ভক্তি – বিশ্বাস নিয়ে তোমরা সকলে আমার একান্ত স্মরণ লও । সব সহজ হয়ে যাবে ।

ভক্ত আমার বড় প্রিয় । ভক্ত আমার প্রাণের প্রাণ । ভক্তের টান শক্ত টান । ভক্তের কারণে আসি ভুবনে, ভক্তজনে করি পরিত্রাণ । মানুষের কল্যাণের জন্যই আমার মর্ত্ত্যে আবির্ভাব ।

শুভ মাঘী পূর্ণিমাতিথিতে গুরুধামের ধর্ম্মীয় মুখপত্র “গুরুধাম পত্রিকা” – আবির্ভাব-বার্ষিকী সংখ্যা ভক্ত-শিষ্যগণ বিভিন্ন রচনা নিয়ে প্রকাশিত হল । আমার আশীর্বাদে “গুরুধাম পত্রিকা” ভারতীয় ধর্ম সাধনার জগতে নতুন আলোর দিশারী হউক এবং ভক্তশিষ্যগণকে ব্রজানন্দ ধর্ম অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করুক ।
ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ । জয় ব্রজানন্দ হরে ।

মাঘী পূর্ণিমা,
১৩৮৪ সন
আশীর্বাদক
শ্রীশ্রী ব্রজানন্দ সরস্বতী

১০৮. ভক্তি মহারাণী । অসম্ভব সম্ভব ঘটায় । অঘটন ঘটায় । ভক্তি রাখ । বিশ্বাস রাখ ।
১০৯. গুরুময় ভূমণ্ডল । গুরুর ইচ্ছা ছাড়া কিছু হইতে পারে না । গাছের পাতা পড়ে না গুরুর ইচ্ছা ছাড়া ।
১১০. আনন্দময় জগৎ । আনন্দম্‌ ! আনন্দম্‌ ! সৃষ্টি স্থিতি লয় আনন্দময় । কেবলই আনন্দ । সুখ দুঃখ বলে কিছু নাই । সুখ দুঃখ মানুষের কল্পনা । কল্পনায় সুখ দুঃখ ভোগ করে মানুষ ।
১১১. নারায়ণ, শিব দুই না । যেই নারায়ণ সেই শিব । নারায়ণও বড় শিব ও বড় । নারায়ণ, শিব ভিন্ন মনে করোনা ।
১১২. লভিতে ফণির মণি থাকে যদি মন, তবে পারিবে কি সহিতে দংশন ? ভেবে দেখ । সংসার পেতেছ ধবংসের সামিল হয়োনা । অজ্ঞ নাবিকের মত সংসার করতে নেই । ভবসিন্ধু-সংসার ভবসিন্ধু । ধীর স্থির নয় । অজ্ঞ নাবিকের নৌকা কুলে পৌছায় না । আবর্ত্ত-সঙ্কুল । ঘুর্ণিপাক আছে । তরঙ্গ পাক দিয়ে উঠছে । বুঝে সুজে চল – হুঁসিয়ার নাবিকের মত । হুঁসিয়ার নাবিকের দরকার । যেমন তেমন নাবিক না – হুঁসিয়ার নাবিকের দরকার । সংসার বুঝে সুজে করতে হয় ।
১১৩. সাপের দন্তে বিষ । সাপের সঙ্গে খেলা করতে হলে – বিষ-দন্তটা উৎপাটন করে ফেলতে হবে । তার পরে সাপ নিয়ে খেলা করতে হবে । আগে বিষদন্ত ফেল । সংসারেরও বিষ – দাঁত আছে । আগে সেই বিষ-দাঁতটী ভেঙ্গে সংসার কর – মজা পাবে ।
১১৪. ভগবানের কাজ যে করতে পারে – সেই ভাগ্যবান । দশজনকে যে পালন করে – সেই ভগবান ।
১১৫. সাধুর চরিত্র – মুদ্রা বোঝে কে ? গুরু নানক বলেন – যিন্‌ ঢোঁরে তিন্‌ পায় । যে খোজে সেই পায় । অপরে নয় ।
১১৬. বৈকুন্ঠ – যেখানে কোন কুন্ঠা নেই । ভগবানের উদয় । দীন-দুঃখিওকা হিতৈষী-ভগবান ।
১১৭. নিয়ম, ন্যায়, নীতি পাপে নাশ হয় । পাপে সমস্ত দুঃখ আনে । দেহের পাপ দূর হয় দরশণ – পরশণে ।
১১৮. আমিকভুআমারনা । সবকিছুইতুমি । দ্রৌপদীযতক্ষণবুঝতেনাপারছিলেন, কাপড়ধরেটানাটানিকরছিলেন । নাপেরেকাপড়টানাটানিছেড়েদিলেন । বুঝতেপারলেন, “আমিকিছুনা, আমিকোনশক্তিনা”। যখনকাপড়টানাটানিছেড়েশরণদিলেনতখনরক্ষাপেলেন ।
১১৯. নামেরআশ্রয়নিলে – কর্মভোগসহজেকাটে । নাহলেকর্মভোগকাটতেচায়না ।
১২০. ওঁনমোশিবায় ! ওঁনমোশিবায় ! ওঁনমোশিবায় ! শিবায়শান্তায়কারণত্রয়হেতবেনিবেদয়ামিচাত্মাণংত্বংগতিপরমেশ্বরং ।
১২১. সবাইকে সমান চক্ষে দেখ । প্রত্যেকের প্রতি সমান ভাব রাখ । ফুল-জল ছিটান – এগুলো কিছুনা দ্বন্দ মিটাও । সবাইকে সমান চক্ষে দেখ । এই ধর্ম ।
১২২. সংসার আনন্দময় । ভগবান কি না দিয়েছেন ? তবু ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ । পিতা-পুত্রের মিল নেই ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নেই । স্বামী-স্ত্রীর মিল নেই ।
১২৩. গুরুকে সাথে করে সংসার করতে হবে । সংসারে এসেছ মুক্ত হতে, বাধা পড়তে নয় । মুক্তিক্ষেত্র । দেবতারা ইচ্ছা করেন সংসারে আসতে । মুক্তিলাভের অধিকারী হতে সংসারে আসতে হয় । মনুষ্য-যোনি মুক্তির পথ, মুক্তিক্ষেত্র । বাধাপ্রাপ্ত হতে না হয়, এ-রকম করে সংসার করবে । সংসারে এসেছ মুক্তি-লাভের জন্য । ভগবানকে সাথে করে সংসার করবে । গুরুকে সাথে করে সংসার করবে । সেটা সংসার নয় । মুক্তিরই কারণ ।
১২৪. আনন্দময়ী মা-ভুখায়িত অবস্থা-অবচেতন ভাব । কয়েকটি নিষ্কাম ভক্ত তাঁকে প্রতিষ্ঠা করে । চতুর্দ্দিক তাঁর প্রচার হয় । শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুও ভুখায়িত অবস্থা ছিল । অবচেতন ভাব ।
১২৫. গুরুর অপার মহিমা । বহ্নিকে পর্বত, পর্বতকে বহ্নি বানাতে পারে ।
১২৬. সংসার কর্মবহুল – ঘটনা প্রবাহ জটিল । এই সংসারের রূপ ।
১২৭. অধর্মে দুঃখ – ধর্মে সুখ ।অধর্ম না করলে দুঃখ আসতে পারে না । দুঃখ হবে কেন ? দুঃখহারী সন্তানের দুঃখ দূর করেন । এই জন্যই পিতা । অধর্ম ছেড়ে দাও । দুঃখ আপনিই পালাবে ।
১২৮. অহং থাকতে প্রভুর দর্শন হয় না । অহং নাশ কর – প্রভুর দর্শন পাবে ।
১২৯. ভবসিন্ধু উত্তাল তরঙ্গময় – আবর্ত্ত-সঙ্কুল । পাক দিয়ে দিয়ে তরঙ্গ ওঠে । স্থির-ধীর নয় ।
১৩০. নামের নেশা নামেই হয় – নেশাতে হয় না । নাম যেমন – তেমন বস্তু না ।
১৩১. জীবভাব নিয়ে ধর্মস্থানে এলেও শান্তি পাবে না ।
১৩২. গুরুশে কপট্‌ – সাদসে চুরি । গুরুর সঙ্গে কপটতা – সাধুর দেবধন চুরি ।
১৩৩. চিকিৎসা যে যা করুক – ভগবান সাথে না থাকলে কিছু হয় না । চিকিৎসা ভগবানকে সাথে রেখে করতে হয়; তবে চিকিৎসা ফলবর্তী হয় ।
১৩৪. একমাত্র তাঁর ইচ্ছায় জগৎ পরিচালিত । জগৎ তাঁর ইচ্ছায় পরিচালিত হয় । তিনিই একমাত্র জগতের স্রষ্টা-নিয়ন্তা-তাঁতেই লয়প্রাপ্ত হয় ।
১৩৫. আসা অর্থ জন্ম সার্থক করা । নইলেত আসা বৃথা । বিবাহ ন কার্য্যায় । বিবাহ ধর্মায় । দুই এ মিলে ধর্ম করা । বিবাহের উদ্দেশ্য ধর্ম অর্জনের জন্য । দুই এ মিলে ধর্ম অর্জন । ন কার্য্যায় ।
১৩৬. ন চ দৈবাৎ পরম্‌ বলম্‌ ।
১৩৭. ভবসিন্ধু – সংসার ভবসিন্ধু । আবর্ত্তময়-উত্তাল-তরঙ্গ-ময় । চরণ-ছাড়া হইও না ।
১৩৮. দাহ্যমান ইতি দেহ । সব সময় জ্বলছে – কেবল জ্বলছে ।
১৩৯. কাঠের নৌকা ডুবে যায় । ধর্মের নৌকা ডোবে না ।
১৪০. সংসার সাগরের খরস্রোতে গা ভাসাইও না । দেহ-তরী ভাসাইয়া দিও না ।
১৪১. প্রেম আর সেবা এই দুই-ই বস্তু । আর সব অবস্তু ।
১৪২. নাম অমূল্য জেনো । ভবসিন্ধু পারের জন্য । ভবসিন্ধু উত্তাল-তরঙ্গময়-আবর্ত্ত-সাঙ্কুল । যেমন তেমন তরঙ্গ না । ঘুরেফিরে বেড়ায় । উত্তাল-তরঙ্গ । আবর্ত্ত-সাঙ্কুল । নাম-অমূল্য ।
১৪৩. পুট্‌লি নিয়ে যেতে পারে না । সারা জীবন পুট্‌লি বানাবা-নিয়ে যেতে পারবা না । ফালাইয়া যাইতে হইব । পুট্‌লি বাইন্দ না । আমিও পুট্‌লি বান্দছিলাম । এই দেখ । একশত টাকার, পাঁচশত টাকার নোট ২৮,০০০ টাকা । এই দেখ পুট্‌লির দশা । এই দেখ পুট্‌লির দশা-যা নিয়ে যেতে পারব না । যা পার ভগবানের সেবায় লাগাইবা ।
১৪৪. গুরু যদি সঙ্গের সাথী হয় – যাওয়া স্থায়ী হয় । যাওয়ার মত যাওয়া । আর আসতে হয় না । পুট্‌লী থাক্‌লে – যাতায়াত কেবল যাতায়াত । আর ছেচা-গুতাত দেখ্‌ছ । পুনরপি জনমম্‌ পুনরপি মরণম । হে মুরারি ত্রাণ কর । বার বার আসা কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার !
১৪৫. যে কোন কাজ গুরুর । গুরুর চরণ অমূল্যধন । খরিদদার নাই । লক্ষ টাকা যার তার কাম না । বড় বাপের বেটীর কাম । অমূল্য ধন – গুরুর চরণ । এক লক্ষ টাকা চাই ।
১৪৬. বিষয়ে বিকার । বিষয় থাকবে – বিকার থাকবে না । বিষয়ে বিকার – বিষয়ানল । বিষয়ানল ।
১৪৭. ধর্ম – পথে শত-বাধা । জটিলা কুটিলা হয় বাদী । কৃষ্ণ-সেবার বাদী । চিরকাল বাধা । ননদিনী – তুই বল্‌গে যা নগরে – ডুবেছে রাই কলঙ্কিনী কলঙ্ক সাগরে ।
১৪৮. ব্রহ্মনাম যার কানে – তারে যমে ছোবে না ।
১৪৯. গুরুনাম মহা পরিত্র নাম । এই নাম নিয়ে যে যেমনে ব্রতী হবে – সে সেই কাজে জয়ী হবে ।
১৫০. সব তিথি সুতিথি – সব বার সুবার বলা যায় । গুরুনাম এমন পরিত্র নাম । তাঁর নাম করে গেলে জয় ছাড়া ক্ষয় নাই । তাঁকে ছেড়েও খুটিনাটি তাঁকে বাদ দিয়ে – এ জন্যই বলেছে – সব তিথি সুতিথি সব বার সুবার – তাঁর নাম করে গেলে । তার লাগে ভদ্রা – যে ভুলে নন্দকুমার । তার লাগে ভদ্রা – যে ত্যাজে নন্দকুমার । ধর্ম-রাজ্যের ভাবই আলাদা । সেই রাজ্যে কেউ পদাপর্নই করে না ।
১৫১. গুরু বাক্য অমৃত বাক্য-ধরতে পারলে হয় ।
১৫২. আধারসে ছোরদে – দুঃখ আপসে ছোর যায়েগা । কায়িক-মানসিক-বাচনিক্‌ তিন দুঃখই দূর হবে ।
১৫৩. জীবনের উদ্দেশ্য ঠিক করা সর্ব্বাগ্রেকর্তব্য । গুরু সেবায় বিঘ্ন ঘটাইয়া নিজ উদ্দেশ্য সাধন, গুরুকৃপা হতে বঞ্চিত করে । আগে ঠিক করতে হবে জীবনের উদ্দেশ্য । তার জন্য নির্দেশিত পথে চলতে হবে । গুরুসেবায় বিঘ্ন ঘটাইয়া জীবনের উদ্দেশ্য সাধন হয় না ।
১৫৪. ব্রজানন্দ জগন্মাতা – জগৎ পালক ।
১৫৫. কত অপরাধ কর ? ধর্মে থাক – অশান্তি কেন হবে ? অধর্ম ছেড়ে দাও – গুরুনাম কর – আপনিই শান্তি হবে ।
১৫৬.
আশীর্ব্বাণী

‘গুরুগিরি’ আমার পেশা নয় । মানুষের ত্রাণ ও মঙ্গলই আমার উদ্দেশ্য । সেইজন্যই আমার মর্ত্ত্যে আগমন । সংসার ভবসিন্ধু আবর্ত্তময় – উত্তাল তরঙ্গময় । দাহ্যমান এই দেহ । গুরুকে সাথে করে সংসার করতে হয় । সংসারে এসেছ মুক্ত হতে – বাঁধা পড়তে নয় । সংসার মুক্তিক্ষেত্র -মুক্তিলাভের অধিকারী হতেই সংসারে আসতে হয় । অজ্ঞ নাবিকের মত সংসার করবে না বিজ্ঞ ও দক্ষ নাবিকের নৌকা কুলে পৌঁছায়, হুঁশিয়ার নাবিক হও । তবেই সোনার সংসার – আনন্দময় সংসার গড়ে তুলতে পারবে । গুরু পূর্ণিমায় গুরুকে একান্তভাবে স্মরণ করার দিন – গুরুর চরণে আত্মসর্পণ করার দিন । গুরু ভগবান – গুরুর অপার মহিমা । এই শুভদিনে তোমরা নামের আশ্রয় গ্রহণ কর । নামই সার । নামের গুণে সর্বপাপ তাপ নাশ হয় । তোমাদের অহং নাশ করো । অহং থাকতে প্রভুর দর্শন হয় না । “আমি কভু আমার না – সব কিছুই তুমি” এই ভাব আন । তবেই গুরুর আশীর্বাদ জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিফলিত হবে – জীবনে পূর্ণতা আসবে । “গুরুধাম পত্রিকা” দীর্ঘজীবী হয়ে ব্রজানন্দ ধর্মাদর্শ দিকে দিকে ছড়িয়ে দিক । আমার আশীর্বাদে ভক্ত শিষ্য সকলের কল্যাণ হউক ।
ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তিঃ,ওঁ শান্তিঃ । জয় ব্রজানন্দ হরে ।

গুরু পূর্ণিমা,
শ্রাবণ-১৩৮৫
আশীর্বাদক
শ্রীশ্রী ব্রজানন্দ সরস্বতী

১৫৭. বাধা বিঘ্নের মস্তকে পা ফেলে চলে আসবে । এই পথে বাধা নেই – তুমি যদি ঠিক থাক । শোন যবন হরিদাস কি বলে – খণ্ড হয়ে যদি যায় দেহ প্রাণ, তথাপি বদনে নাহি ছাড়ি হরিণাম । কেমন জোরের কথা । এই পথে বাধা নেই । নিজে একটু ঠিক থাকলেই হয় ।
১৫৮. নামের প্রভাবে কি না হয় । নামের প্রভাবে হাজার হাজার পাপ ক্ষয় হয় । নামের তুল্য আর কি আছে জগতে ? মানুষ কত পাপ করবে -পরিষ্কার হইতে কতক্ষণ ? হনুমান সেতু বন্ধন না করে জয় রাম বলে এক লাফে সাগর পা হয়ে গেল । নাম এমন বস্তু । নাম ধর শক্ত করে – সব পরিষ্কার হয়ে যাবে । এ নাম সুধামাখা – জীবের পাপ ক্ষয় করে – নামে রুচি জন্মায় – গুরুতে প্রেমের উদয় হয়।ধর নাম শক্ত করে । নুলাপুত হলে চলবেনা । ধর শক্ত করে ‘নায়মাত্না বলহীনেন লভ্য’। বলহীন পুরুষ কি আর শক্তি সঞ্চার করতে পারে ? নাম এমন -কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য এই ষড় রিপুকে ভষ্ম করে ফেলে । যবন হরিদাস হরিণাম জপ করছে । এমন সময় কাজী পাঠালেন এক অপ্সরাকে তার ধ্যান ভঙ্গ করতে । কাজী অপ্সরাকে আদেশ করলেন – হরিদাসের ধ্যান ভঙ্গ কর, সাধুগিরি দাও নষ্ট করে । হরিদাস ধ্যানে মগ্ন । কামাতুরা অপ্সরা ডাকে কৈ সাধু, এস না ! হরিদাস বলে, একটু দেরী কর । পুনঃ পুনঃ ঐ একই উত্তর একটু দেরী কর । এদিকে রাত প্রভাত হয়ে এল । কাজী জিজ্ঞাসা করলেন অপ্সরা কি হল ? অপ্সরা উত্তর দিল কিছুই হয় নাই । হরিদাস সারারাত নামে ডুবে ছিল । শুনে কাজী আদেশ করলেন – আজ রাতে আবার যাও । রাত হলে অপ্সরা সাজ সজ্জা করে হরিদাসের কাছে গিয়ে বল্‌ল – কি সাধু কি হল ? হরিদাস উত্তর দেয় – আর একটু জপ বাকী আছে । অপ্সরা যতবার ডাকে হরিদাস ততবারই উত্তর দেয় আর একটু জপ করে নেই । অপ্সরা ভাবে – এমন সাধু আর আমি নিতান্ত পিশাচিনী নারকী । আমার নরকেও স্থান নেই । হরিদাসের নিকট প্রার্থনা জানায় আমাকে দয়া করে ভেক দিন । টাকা, পয়সা সোনা গয়না সব গঙ্গায় বিসর্জন দিয়া বলে – আমার গতি কি হবে, বাবা ? আমার নরকেও স্থান নেই । সব গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করে অপ্সরা । দলে দলে লোক দর্শন করতে যায় এই সন্ন্যাসিনীকে । বেশ্যা হইল পরম মহন্তী রক্ত বস্ত্র পরিহিতা কেমন আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন, বেশ্যা হইল সন্ন্যাসিনী । দলে দলে লোক আসে দর্শন প্রার্থী হয়ে । নামের মহিমা – নাম ব্রহ্মাণ্ড ।
১৫৯. বৈষ্ণবের পদধূলি শিবের ভূষণ করিয়া এড়াও, ভাই, সংসার বন্ধন ।
১৬০. গঙ্গাম্বু সেবন, গঙ্গার তীরে বাস, গঙ্গা স্নান মহা ভাগ্য । তব তট নিকটে যস্য নিবাস – খলু বৈকুন্ঠে তস্য নিবাস ।
১৬১. সে যে ফুরৎ ফুরুৎ করে বেড়ায় – কারো বাধা মানে না । পাবে কি করে ? সাধন না করলে সাধনার ধন পাওয়া যায় না । সাধন করবে তবেত সিদ্ধিলাভ হবে । প্রতি মাস পয়লা দর্শন করে যাবে । কোন খরচ-পাতি নাই ।
১৬২. সেবাতে প্রসন্ন হলে মোক্ষলাভ হয় । সেবা এমন বস্তু ।
১৬৩. ইন্দ্রিয় ও মনের গতির প্রভাব ভয়ঙ্কর । লাগাম কষে ধর । ইন্দ্রিয়ের লাগাম কষে ধর । মনের লাগাম কষে ধর ।
১৬৪. দীক্ষা গ্রহণ করতে দিন ক্ষণ মলমাস আটকায় না ।
১৬৫. চরণ শক্ত করে ধরলে বিপদ কি করবে ? বিপদের মাথায় পা দিয়ে চলবে । বিপদ কি ? আপদে বিপদে যদি মজে রামপদে্‌, আপদ বিপদ কি করবে ? রূপ সাগরে দেওনা ডুব, আপদ বিপদ দূর হবে ।
১৬৭. এক রোটি যো দেগা এক ছেলের মা হবে । দো রোটি যো দেগা দুই ছেলের মা হবে । তিন রোটি যো দেগা তিন ছেলের মা হবে । রুটির বন্দোবস্ত কর ছেলে আনব ! এক সাধু দুপুর বেলায় এই বলে যাচ্ছিল । ঐ রাস্তার ধারে এক অপুত্রক গৃহস্থের বাড়ী । তার কানে যেই এই কথা গেল সে আনন্দে আত্মহারা । হাম্‌ তিন রোটি দেগা । ডাল-তরকারী-রুটি দিয়া সাধুর সেবা দিল প্রেমসে । সাধুর আশীর্বাদ পড়ল তিন ছেল হবে । একদিন নারদ ঐ পথে যাচ্ছিল । ইতিমধ্যে গৃহস্তের তিন ছেলে হল । নারদ গৃহস্তের তিন ছেলে দেখে, ভাবেন-ভগবান বলেছিলেন তার সন্তান হবে না । এখন নারদ তিন ছেলে দেখে অবাক । দেখে, তিন ছেলে ছুটাছুটি করছে । নারদ গৃহস্তের বললেন ভগবান বলেছিলেন তোমার সন্তান হবে না – দেখছি তোমার তিন ছেলে হয়েছে । তখন গৃহস্ত প্রকৃত ঘটনা বলে দিল নারদকে ! সাধুর আশীর্বাদেই তার তিন ছেলে হয়েছে । সাধু যদি ভগবান হয় তা হলে এই রকমই হয় ! সাধু ভগবান । তোমার কপালে যদি সন্তান না থাকে – সাধুর কৃপা দৃষ্টিতে সন্তান হবেই । যো না করে লকির সো করে ফকির । কপালের লেখায় যা না করে সাধু তা করে । জিস্‌কো না দেয় আল্লা – উস্‌কো দেয় – ফকির মোল্লা – আল্লা যাকে না দেয় – ফকির মোল্লা তাকে দেয় ।
১৬৮. প্রসাদে গোবিন্দে নাম – ব্রহ্মণি বৈষ্ণবে, সর্ব পুণ্যবতাং বিশ্বাসোনৈজায়তে । গোবিন্দে আর প্রসাদে নাম ব্রজে আর বৈষ্ণবে পুণ্যের জোর খুব বেশী যার বিশ্বাস হয়; সকল পুণ্যবানের হয় না ।
১৬৯. এই মূর্ত্তির কাছে কাম, ক্রোধ কাঁপে থর থর । লোভে, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য পালায় চকিতে । এই মূর্ত্তি দর্শনে পাপ নিঃশেষ হয়ে যায় । সুখ শান্তিতে সংসার ভরপুর হয় ।
১৭০. জীব কল্যাণের জন্য গুরুধাম গোলকধাম প্রতিষ্ঠা । জীব উদ্ধার হবে । জগৎ উদ্ধারণ নাম ‘ব্রজানন্দ’ । দিনান্তে একবার স্মরণ করবে ।
১৭১. ব্রজানন্দ এই দু’ পোয়া দেহের মধ্যে নয় । ব্রজানন্দ সর্ব্ব-ব্যাপী সত্ত্বা । ব্রজানন্দ অনন্ত, ভজবেত বিরাট অনন্তের – অসীমের ভজনা করবে । সমীমের উপাসনা করবে না । ব্রজানন্দ নিত্যসত্ত্বা । ব্রজানন্দ অসীম, অনন্ত, বিরাট সত্ত্বা । সসীমের উপাসনা করবে না । ব্রজানন্দ বিরাট, অসীম, অনন্ত এই ভাব নিয়ে ভজন, তা হলেই সেই অবস্থা প্রাপ্ত হবে । মন ছড়াইয়া আছে গুটাইয়া আনতে হবে ।
১৭২. দেহ কয় দিনের ? দেহিকে ধর । দেহ টানাটানি করনা । যিনি অনন্ত অনাদি তাঁর সন্ধান কর ।
১৭৩. যে শিষ্য গুরু হতে দূরে সে ভগবান হতেও দূরে ।
১৭৪. শিক্ষার ফল আত্ম-বিকাশ । প্রকৃত শিক্ষালাভ করা চাই ।
১৭৫. যার প্রসাদে ভক্তি আছে – আগ্রহ আছে সে আপনি আসিয়া চাহিয়া লয় – তাকে ডাকতে হয় না ।
১৭৬. উদিতে জপতি নাথে । সূর্য্যোদয়ের পূর্বে গাত্রোত্থান করতে হয় – অন্যথায় সূর্য্যদেবকে অমান্য করা হয় ।
১৭৭. শিক্ষার চরম ফল – প্রকৃত শিক্ষার প্রভাব এই – ধর্ম পরাণয় হবে । প্রকৃত শিক্ষা না পাইলে ধর্মহীন পণ্ডিত হয় । যে শিক্ষা ধর্মহীন পণ্ডিত তৈরি করে – সে শিক্ষা কুশিক্ষা । সে শিক্ষা শিক্ষাই নয় ।
১৭৮. শ্রীগুরুর পদধৌত জল মস্তকে লও । জীবন সফল – কৃত কৃতার্থ – কিছু বাকি থাকে না । ওঁ গুরুবে নমঃ । ন গুরোরধিকম্‌ । গুরু সব চেয়ে আপন । সফল জনম – সফল জীবন ।
১৭৯. আমার হিত হউক বা না হউক – গুরুধামের হিত হউক – ধাম-বাসীদের এই মহামন্ত্র জীবন বেদ । এই ভাব নিয়ে না থাকলে – না হবে ধর্মের মঙ্গল – না হবে তোমার মঙ্গল । ত্যাগী হতে হবে – গৃহী নয় । ধামের হিতার্থে আপন স্বার্থ বিসর্জন দিতে হবে । ভক্ত-শিষ্যদের আপন জ্ঞান করতে হবে । গুরু ধামের আইনই আলাদা । এখানে নিজ স্বার্থ হারাইতে হবে । অন্যথায় না হবে ইহকালের – না হবে পরকালের মঙ্গল ।
১৮০. ব্রজানন্দ সত্য নাম – ওঁকার মধ্যে কাশীধাম । এই লীলার উদ্দেশ্য জীব – কল্যাণ । আমার সব কিছু খাওয়া-উঠা-বসা জীবের কল্যাণের জন্য ।
১৮১. মাইরা সোনা বাক্স রাখে – দেহটা সেই রকম । মাইরা সোনার বাক্সটা চোখে চোখে রাখে । যেখানেই থাকুক – চোখ থাকে সোনার বাক্সের উপর । সেইরকম দেহটার উপর চোখ রাখতে হয় । দেহটা যেন সুস্থ সবল থাকে ।
১৮২. ধর্ম দিয়া মানুষ শান্তিলাভ করে । ধর্মহীন জীবন – তাই কেবল গোলমাল আর গোলমাল । শান্তি নাই । কর ধর্ম – কর্ম শান্তিলাভ হবে । ধর্ম-কর্ম নাই । শান্তিলাভ হবে কি করে ? দিনরাত অগণিত অধর্ম কর্ম । ধর্মহীন জীবন – শান্তিলাভ হবে কি করে ?
১৮৩. নাম গ্রহণ কর – দেহ পবিত্র হউক । দেহ-মন পবিত্র না হলে কোন কার্য্যই সিদ্ধিলাভ হয় না । নাম গ্রহণ কর – সব দিক দিয়া মঙ্গল হবে ।
১৮৪. তাঁর নামে ক্ষয় নাই । তাঁর নাম দিয়ে আরম্ভ করলে জয় অবশ্যম্ভাবী ।
১৮৫. কাল বড় ভয়ঙ্কর । কালের প্রভাবে মনের পরিবর্তন হতে পারে । শুভ-বাসনা সব সময় মনে জাগে না । কাজেই শুভস্য শীঘ্রম্‌ । নিঃশ্বাসের নাই বিশ্বাস । মরিয়াও শান্তি পাবে না । মরণইত শেষ নয় – পরকাল আছে । শুভ বাসনা কি সব সময় মনে জাগে ? মনের পরিবর্তন হ’তে কতক্ষণ ? দীক্ষার বাসনা যখনই লুটাইয়া দে-সঙ্গের সাথী কেউ হবে না ।
১৮৬. ভক্ত শিষ্য একার্থ বাচক । ভক্ত শিষ্য উভয়েই সমর্পিত প্রাণ । দীক্ষিতের কাজ একটু তাড়াতাড়ি হয় সাধন ক্ষেত্রে গুরুর সাহায্য পায় । উভয়েরই এক অবস্থা ।
১৮৭. তোমাদের পূর্ণ বস্তু দিয়েছি । অসম্পূর্ণ কিছু রাখি নাই । ঐ যে নাম দিয়েছি – নামের কাছে চাইলেই সব পাবে । চাইলেই আমার দেখা পাবে । এই রকম – যেমন আমার দেহে হাত বুলাচ্ছ – সেই রকম । এই জন্য দেহ নষ্ট করা হয় না, সমাধি দেওয়া হয় । সমাধি থেকে সময় সময় দর্শন দেন । দেহ নশ্বর – এই আইন আমার । আমি কি এই আইন লঙ্ঘন করতে পারি ? পারি না । এই আসন রেখে গেলাম । এই আসন রক্ষা করে রাখবে তা হলে আমাকে পাবে । এই আসনই ব্রজানন্দ এই বিশ্বাস যদি রাখতে পার তবে তোমরা কখনই আমার অভাব অনুভব করবে না । আমাকে চিরকাল পাবে ।
১৮৮. এই জগতে তিনটি বস্তু দুলর্ভ । সাধু দর্শন, মনুষ্য জন্ম, সৎ গুরুলাভ । সাধু দর্শন দুলর্ভ দর্শন । সৎগুরুলাভ সাধন সাপেক্ষ । মনুষ্য-জন্ম দুলর্ভ জন্ম । ৮৪ লক্ষ যোনি ভ্রমণ করে তবে মনুষ্য যোনি লাভ হয় । মনুষ্য জন্ম দুলর্ভ এই অর্থে । মন ঠিক করা সাধন-সাপেক্ষ । মায়ায় মুগ্ধ হয়ে এই মন কত কাল মলিন হয়ে আছে । সেই মনকে শুদ্ধ শান্ত করা সাধন সাপেক্ষ । যজ্ঞ করতে হয় তপস্যা করতে হয় । তপস্যা যজ্ঞ এক কথায় উঠেই গেছে । তপস্যা কেউ বোঝেই না – তপস্যা কি । বিষয়াভিমুখী মন ত মলিন হয়ে আছে । মনকে শুদ্ধ শান্ত কর । অঙ্গারের ময়লা কাটে অগ্নির দহনে । মনের ময়লা কাটে সাধু সম্মেলন – তপোযজ্ঞে । তপস্যা যজ্ঞত উঠেই গেছে । সহজ পথে সাধু সঙ্গ করে মনের ময়লা কাটাও । মনকে শান্ত শুদ্ধ কর । করতে থাক । মহতের দর্শন যেখানেই পাও করো । সহজ পথ দর্শন পরশন । একটা ধরতে পারলেই হয় । মন এদিক সেদিক যায় বলে ছাড়বে না । বস্‌বে-বস্‌বে । যুদ্ধ করতে করতে মন বস্‌বে । ছাড়বে না – ছাড়বে না । মনকে টেনে আনবে । যতবার মন এদিক সেদিক যায় – টেনে আনবে পথে । পানা পুকুরে স্নান করলে – হাত দিয়ে পানা সরাতে হয় । অভ্যাস রাখ । এই জন্যই নাম – জপ । অভ্যাস রাখ ।অভ্যাস যোগ যোগাভ্যাস । দর্শন কর – এগিয়ে যাবে । সাধন ভজন করার সময় সুযোগ – সুবিধাত নেই । কাজেই মহাপুরুষের কৃপালাভ করো । যেমন ইঞ্জিনের সাথে মালগাড়ী । মহাপুরুষের সাথে সঙ্গ করো । মনের ময়লা কাটে সাধু সম্মেলনে । সাধন ভজনের যুগত নয় – ঘোর কলি ।
১৮৯. উপাধী, বাড়াবেনা – অশান্তি ভোগ হবে । সংকোচ শক্তি অবলম্বন করতে হবে – উপাধি বাড়াবে না । কেহ মিনিষ্টার – কেহ লাট । এখন গাড়ী ছাড়া চলেনা – এই উপাধি । এই উপাধি । যখন গাড়ী রাখার ক্ষমতার অবসান হ’বে –অশান্তি ভোগ হ’বে । খুব সংক্ষেপ করে চলবে উপাধি বাড়াবে না । খুব ঠাণ্ডাভাবে থাকবে – খুব সিধাভাবে থাকবে – মনটা শান্তিতে থাকবে । ঠাণ্ডাভাবে থাক – কিছুতে পাবে না । উপাধি বাড়ালেই লোকের চোখ পড়ে ।
১৯০. পাপজ ব্যাধি নিরাময় হতে – তীর্থ, ধর্ম, দানপুন্য প্রয়োজন । অর্ন্তব্যাধি বহির্ব্যাধি উভয়ই ।
১৯১. এক রাজরাণী রামভক্ত ছিলেন – কিন্তু রাজা রামভক্ত ছিলেন না । রাণী এজন্য দুঃখিত । রাণীর আক্ষেপ – রাজা যদি রামভক্ত হইতেন – তিনি জোর পাইতেন । এক রাত্রে রানী শুনতে পান রাজা ঘুমন্ত অবস্থায় – রাম রাম উচ্চারণ করছেন । রানীর আনন্দের পরিসীমা নাই । রাণী ভাবেন – এমন রামভক্ত স্বামী – এতদিন চিনতে পারেন নাই । এমন মহাপুরুষ স্বামী – তাঁর উপর এই ভুল ধারণা তাঁর । রাণী মনের আনন্দে প্রজাদের মিঠাই – মণ্ডা খাওয়ালেন । মন্ত্রীকে আদেশ দেন – মন্ত্রী এই মম রাজ্যে ঢোল পিটাইয়া দিলেন । প্রজারা সাজসজ্জ্বা করে দলে দলে এসে ভোজনে আপ্পায়িত হইল । এদিকে রাজা এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন না । দেখে শুনে রাণীকে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপার কি ? রাণী আনন্দে সকল কথা রাজাকে বললেন । অবশেষে বললেন এজন্যই আমি প্রজাদের মিঠাই মণ্ডা সেবা দিয়া আনন্দ করতে আদেশ করেছি । আমি রামভক্ত – তুমি কোন দিন রামনাম কর নাই । এজন্য আমার মনে দুঃখের অবধি ছিল না । এক রাত্রে তুমি ঘুমন্ত অবস্থায় রামরাম উচ্চারণ করেছ তাই শুনে আমার এত আনন্দ । এই শুনে রাজা ভাবেন যে কথা এতদিন আমি সযত্নে গোপন রেখেছি, ঘুমন্ত অবস্থায় তাহা প্রকাশ হয়ে পড়ল । এই বলতে বলেতেই সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে গিয়ে রাজার মৃত্যু হয় । সাধন করবে – মনে – বনে কোণে ।
১৯২. মানুষ ভগবানের দর্শন পেয়েছ – জীবন সফল – অমঙ্গল দূর হয়েছে – মনোবাসনা পূর্ণ হবে । দর্শনে অমঙ্গল দূর হয় – মনোবাসনা পূর্ণ হয় । সব দিক দিয়ে জয় হয় ।
১৯৩. আত্মশক্তির উপর নির্ভর দিয়েছিলে – সুফল হয় নাই । এখন ভগবানে নির্ভর দিয়েছ – ফলপ্রসূ হবে । আশীর্বাদ অমোঘ ।
১৯৪. গুরু এসেছেন – জোর কর । এমন দিন আর পাবে না । কি ভাবনা আর, এসেছে এবার, দাতা শিরোমণি করুণা আধার । দাতা গ্রহীতা দুইই বরাবর । যেমন দাতা – তেমন গ্রহীতা । বলি রাজা আর বামন । ত্রিপাদ ভূমি । আর এক পাদ রাখার জায়গা নাই । দুইই বরাবর চাই – রমারম । যেমন দাতা – তেমন গ্রহীতা । ওঁ কৃষ্ণায় ব্রজানন্দায় নমঃ ।
১৯৫. ভক্তালয়ে সেবা-আমার কত আনন্দ । নুপুরের শব্দ কাণে গেল তোমার । নুপুরের ধ্বনি শুনে ধন্য হলে । আর একটু অগ্রসর হলেই – একটা লাঠি নিয়ে – গোপাল দর্শন হয়ে যেত । এক ভক্ত আমায় গোপাল রূপে ভজনা করত । নুপুরের ধ্বনি শুনে তার মনে হল চোর এসেছে তার গোপাল চুরি করে নিয়ে যাবে । চোর তাড়াতে লাঠি নিয়ে এল । পরে আমার চতুভুর্জ মূর্ত্তি দেখে – আমার গোপাল রূপ দর্শন করে বুঝল – চোর নয় গোপাল স্বয়ং । হাত থেকে লাঠি ফেলে দিল – নইলে আমাকে লাঠির বাড়ি খেতে হত – যদি আমি আমার রূপ না দেখাইতাম । নুপুরত বাজবেই ভক্তালয়ে আনন্দধ্বনি – নুপুরত বাজবেই । লাঠির ভয়ে নিজ মূর্ত্তি ধারণ করতে হয় । আর একটু অগ্রসর হলেই – শংখ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণ দর্শন হত তোমার । মহাভাগ্য !
১৯৬. কোন দিন মনে করনা – তুমি একা । একা তুমি কিছুতেই হতে পার না । তোমার সাথে থাকবই আমি । বেড়া শক্ত করে দিবে – ফাঁক যেন না থাকে । তা হলে গরু বাছুর ঢুকে – সব নষ্ট করে ফেলবে । বেড়ায় কোন ফাঁক যেন না থাকে । হুঁশিয়ার !
১৯৭. ঠিক ঠিকমত ব্যারিষ্টারি করতে পারলে না । একটু খানি গোলমাল করে ফেল্‌লে । মারু ভক্ত দেখ নাই । সেবাইত বলে – বাবা শয়নে আছেন এখন দর্শন হবে না । মারু ভক্ত উত্তর দেয় – জগৎ যাক্‌ আর থাক্‌ – দর্শন না করে যাব না । আমার কর্ম না করে আমি যাই না । আমার আদায় পুরা না করে যাইনা । বাবা যে অবস্থায় থাকুন – শয়ণে থাকুন তুমি ঠকাইবার কে ? মারুভক্ত একেই বলে ।
১৯৮. সময় নাই – সময় নাই, সেবার দ্রব্য হাতে নিয়ে একটু মুখে দিন । মুখে দিয়ে দেখুন । সময় মত হলে হয় । যখন তখন কি সেবা হতে পারে ? এখনও কি আমি গোপাল নাকি ? সময় মত হলে হয় ।
১৯৯. বি. এ.পাশ, এম এ পাশ নামের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাকে শোনাও । গালভরা কথা – কথার সরিত সাগর । প্রশ্ন প্রতিপাদ্য বিষয় প্রকৃত বিদ্যালাভ হতে অনেক দূরে । যে বিদ্যাতে আত্মবিকাশ আত্মজ্ঞান লাভ হয় না সে বিদ্যা বিদ্যাই না । আচার্য্যবাণ স এব বিদ্বান । চরিত্রবাণ লভতে জ্ঞানম্‌ । বর্ত্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একমাত্র অর্থকরী বিদ্যালাভই হয় । বর্ত্তমান শিক্ষায় দেশ ছারখার হয়ে গেল । না হয় চরিত্রোন্নতি না হয় ধর্মে বিশ্বাস । চরিত্রবাণ স এব বিদ্বান্‌ ।
২০০. মানুষের ধৈর্য্য থাকা একান্ত প্রয়োজন । ধৈর্য্য না থাকলে সে মানুষই না । তার পদে পদে পরাজয় । ধৈর্য্য ধরে থাক । আমি আছি তোমার পাছে পাছে ।
২০১. চিরস্থায়ী কর্ম কর । পাকা পাকি কর্ম হলে কিছুদিন থাকে । আম সন্দেশত রাত প্রভাত হলেই নিঃশেষ । পাকা কাম কর কিছুকাল থাকবে ।
২০২. গাভী বিষ্ণুর অবতার । দেবালয় গাভী পালন, গো-সেবা শাস্ত্র-সম্মত । গো-সেবা পরম ধর্ম । পূজা-আর্চ্চায় পঞ্চামৃত, গোরচনা, গোবর প্রয়োজন হয় । কামধেণু গাভী যখনই দোয়ারে দুধ পাবে তখনই । যত্ন পরিচর্য্যা অত্যাবশ্যক । মশায় না কামড়ায় সেই জন্য মশারি টানিয়ে দিতে হয় । আখড়ায়, আখড়ায় কামধেণু পালন করা হয় । কামধেণু যখনই দোয়ায় দুধ দেয় । ইহার জন্য বংশগত শক্তি, উপযুক্ত খাদ্য, যত্ন-পরিচর্য্যা, সেবা যত্ন অত্যাবশ্যক । গো-সেবায় অনুরাগ ভাল গৃহস্থের লক্ষণ । গোগৃহে-দেবগৃহে-পিতামাতাকে প্রত্যুষে শ্রদ্ধাসহকারে ভক্তি প্রদর্শন অবশ্য কর্ত্তব্য ।
২০৩. সেই সমুদ্রেই ঝাঁপ দেও – শান্তির সমুদ্রে ঝাঁপ দেও – শান্তির সমুদ্রে – ভক্তির সমুদ্রে মিশে যাও । একাকার হয়ে যাও । শান্তির জাহাজের সঙ্গে জালিবোট বেঁধে নিব আমি । আমি আমার করে নিব – তুমি মনে-প্রাণে ঝাঁপিয়ে পড় । যার নাই – আমি তারে দিয়ে নেই । যার আছে তার রক্ষা করি । কারো অভাব রাখিনা । সবার অভাব পূরণ করি ।
২০৪. হ্যাম্‌ থাকো রামে – থাকো রামে সাঁইয়া – জগৎ বৈরী হলেও – জগৎ বৈরী হয়েছে ভি-কুছ না কর সাকে । দুযমন্‌ কুছ না কর সাকে । যাকো রাখে সাঁইয়া দুষমন কুছ না কর সাকে । বিশ্বাস রাখ ।
২০৫. যো আয়া হ্যায়, সো জায়গা ভি-রাজা, ভিখারী, ধনী, নির্ধন । মন মরি না মায়া মরি । কত ভক্ত চলে গেছে – মায়াকে কেউ মারতে পারে নাই । মনও মরে না – মায়াও মরেনা । আশা তৃষ্ণার শেষ নাই । মায়া অনন্তকাল থেকে আছে – অনন্তকাল থাকবেও ।
২০৬. গাছে ওঠে মরতে – জামিন হয় ভরতে । নিজানন্দ সাধুর মৃত্যু প্রসঙ্গ । ঢাকায় হরতাল । গাভীর জন্য ঘাস ক্রয় করা সম্ভব হয় নাই পর পর কয় দিন । আজ গাভীর অনশনের সম্ভাবনা দূরীকরণার্থে, আম্রপত্র সংগ্রহের জন্য আম্রবৃক্ষে উঠিয়া আম্রপত্র তুলিতেছেন ।এদিকে ঠাকুর তার জন্য বিচলিত হইয়া খোঁজ করিতেছেন – কোথায় যেন নিজানন্দ সাধু ? গাছের উপর তাঁহাকে দেখিয়া – গাছ হইতে নামিতে আদেশ করিলেন । ঠাকুর অমঙ্গল আশঙ্কাই করিতেছিলেন । গাছ হইতে নামিয়া আসিতে আদেশ করিয়া সবে মাত্র আসনে উপবেশন করিয়াছেন – সেই মূহুর্ত্তে সাধু গাছ হইতে পড়িয়া প্রাণত্যাগ করিলেন । সংবাদ পাইবা মাত্রা ঠাকুর ঘটনাস্থলে ছুটিয়া আসিলেন । শোক-সন্তপ্ত হৃদয়ে তাঁহার অন্তোষ্টি-ক্রিয়ার ব্যবস্থা করিলেন । শিব-ধামের প্রাঙ্গণেই তাঁহার অন্তোষ্টি-ক্রিয়া সম্পন্ন হইল । শ্রীশ্রীঠাকুরের একনিষ্ট শিষ্যের স্মৃতি-রক্ষার্থে, শিবের অর্থব্যয়ে তাঁহার স্মৃতিমঠ নির্মিত হইল । কথা প্রসঙ্গে একদিন ঠাকুর নিজানন্দ সাধুর বিবিধ গুণাবলির উল্লেখ করেন । সেই সঙ্গে ঠাকুর একটি ঘটনা ব্যক্ত করেন । একদিন তিনি নিজানন্দ সাধু প্রমুখ ভক্ত-শিষ্যের নিকট-সম্ভাব্য স্বীয় মহা-প্রয়াণের পর কোথায় কিভাবে শ্রীদেহ রক্ষা করিতে হইবে সেই বিষয়ে বিশদ উপদেশ প্রদান করিলেন । অতঃপর নিজানন্দ সাধু কাতর কন্ঠে নিবেদন করিলেন – বাবা আপনিত আপনার নিজের দেহরক্ষার ব্যবস্থা করিলেন । আমার কি ব্যবস্থা হইবে জানিতে বাসনা হয়, দয়াময় । মনে হয় শ্রীশ্রীঠাকুরের দেহরক্ষার সম্ভাব্যতা স্মরণ করিয়া – শোক বিহ্বল চিত্তে তাহার পূর্বেই স্বীয় দেহ রক্ষার প্রার্থনা চরণে নিবেদন করিয়াছিলেন । কৃপাপরবশ হইয়া ঠাকুর তাঁহার আকুল প্রার্থনা সার্থক করিলেন । ঠাকুর তাঁহার প্রশংসায় পঞ্চমুখ । বলা বাহুল্য তিনি ছিলেন একজন আদর্শ একনিষ্ট গুরু-সেবী । গুরু-সেবাই ছিল তার জীবন বেদ । বাবা বলেন – শিবধাম একেবারে অন্ধকার করে গেল ।
২০৮. গুরু-পাটে ত্রিরাত্রবাস শাস্ত্রের বিধান ।
২০৯. নিরাকার থেকে সাকার মূর্ত্তি ধারণ করেছি । বাক্য দিলাম – বাঁচাইলাম । তার রোগ আমি গ্রহণ করলাম । ভক্ত বলে – ও কথা বলবো না । আমি বলি – মুখে এসে পড়েছে – আমি কি করব ? আমার ভক্তের মধ্যে কুটিপতি আছে – কারবার করে কুটিপতি হয়েছে । ভক্ত বলে – তোমার দয়ায় হয়েছে – তোমার দয়ার নাই বিরাম – ঝরে অবিরাম ।

আশীর্ব্বাণী

২১০. জীব কল্যাণের জন্য “গুরুধাম” গোলকধাম প্রতিষ্ঠা । জীব উদ্ধার হবে । জগৎ উদ্ধারণ নাম ব্রজানন্দ, দিনান্তে একবার স্মরণ করবে । বাধা বিঘ্নের মস্তকে পা ফেলে চলে আসবে । এই পথে কোন বাধা নেই – তুমি যদি ঠিক থাক । শোন যবন হরিদাস কি বলে – খণ্ড খণ্ড হয়ে যদি যায় দেহ প্রাণ, তথাপি বদনে নাহি ছাড়ি হরিনাম । কেমন জোরের কথা ! নিজে একটু ঠিক থাকলেই হয় । এই মূর্ত্তির কাছে কাম, ক্রোধ, কাঁপে থর থর । লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য্য পালায় চকিতে । এই মূর্ত্তি দর্শনে পাপ নিঃশেষ হয়ে যায় । সুখ শান্তিতে সংসার ভরপুর হয় । ব্রজানন্দ এই দুপোয়া দেহের মধ্যে নয় । ব্রজানন্দ সর্ব্ব-ব্যাপী সত্ত্বা । ব্রজানন্দ অসীম, অনন্ত, সর্ব্ব-ব্যাপী । ব্রজানন্দ বিরাট, অসীম, অনন্ত, এই ভাব লয়ে ভজবে, তা হলেই সেই অবস্থা প্রাপ্ত হবে । মন ছড়ায়ে আছে গুটায়ে আনতে হবে । ব্রজানন্দ সত্য নাম-ওঁকার মধ্যে কাশীধাম । এই লীলার উদ্দেশ্য জীব কল্যাণ । আমার সব কিছু খাওয়া ওঠা বসা জীবের কল্যাণের জন্য । এই জগতে তিনটি বস্তু দুলর্ভ । মনুষ্য-জন্ম দুলর্ভ জন্ম । সাধু দর্শন দুলর্ভ দর্শন । সৎগুরুলাভ সাধন সাপেক্ষ । মানুষ ভগবানের দর্শন পেয়েছে – জীবন সফল, অমঙ্গল দূর হবে, মনোবাসনা পূর্ণ হবে । দর্শনে অমঙ্গল দূর হয়, মনোবাসনা পূর্ণ হয় । সবদিক দিয়ে জয় হয় । শান্তির সমুদ্রে ঝাঁপ দাও – শান্তির সমুদ্রে – ভক্তির সমুদ্রে মিশে যাও, একাকার হয়ে যাও । শান্তির জাহাজে জালিবোট বেঁধে নেব আমি । আমি আমার কর নেব, তুমি মনে প্রাণে ঝাঁপিয়ে পড় ।
২১১. যা সঞ্চয় করেছ, তাই নিয়েই ত আসবে আমার এখানে । তার বেশী নিয়ে আসবে কোথা থেকে ! যা জন্ম জন্ম সঞ্চয় করেছ তাইতো তোমার পুঁজি । এই আসা যাওয়ার মধ্যেই জন্ম জন্মান্তর । যার সুকৃতি আছে শেষ পর্য্যন্ত সে পার হয়ে যায় । ধ্রুবও প্রথম কামনা লয়েই এসেছিল ভগবানের কাছে । পরে ভগবান দর্শন হলে, তার কামনা বাসনা নেই । রাজ্য চাই না, রাজা হতে চাই না । সব চাওয়া পাওয়ার শেষ । পরমার্থ লাভ হলে আর চাওয়া পাওয়ার কিছুই থাকে না । চাইবার ও কিছুই থাকে না । অনেকেই এভাবে তরে যায় । যারা নিতান্ত বদ্ধ জীব, তারাই শুধু পড়ে থাকে । মায়া তেরি তিন নাম পরমা, পরেমা, পরেশরাম । নিরাকার থেকে সাকার মূর্ত্তি ধারণ করেছি । বাক্য দিলাম, বাঁচালাম । তার রোগ আমি গ্রহণ করলাম । ভক্ত বলে ও কথা বলবেন না । আমি বলি মুখে এসে পড়েছে, আমি কি করব ? ভক্ত বলে তোমার দয়ার অন্ত নেই, তোমার দয়ার নেই বিরাম, ঝড়ে অবিরাম । শুভ মাঘী পূর্ণিমায় আমার আবির্ভাব দিবসে গুরুধামের ধর্মীয় মুখপাত্র “গুরুধাম পত্রিকার” নবম সংখ্যা ভক্ত শিষ্যগণের বিভিন্ন রচনা লয়ে প্রকাশিত হল । আশীর্বাদ করি “গুরুধাম পত্রিকা” ভারতীয় ধর্ম সাধনার জগতে নূতন আশা ও আলোর বর্ত্তিকা লয়ে অগ্রসর হউক এবং ভক্ত শিষ্যগণ ব্রজানন্দ ধর্মানুশীলনে সফল হউক ।
ওঁ শান্তিঃ, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তিঃ । জয় ব্রজানন্দ হরে ।

মাঘী পূর্নিমা,
১৩৮৫ সন
আশীর্বাদক
শ্রীশ্রী স্বামী ব্রজানন্দ

২১২. যিনি রোগ দিয়েছেন – তিনিই রোগ নিতে পারেন । যে রোগ দেয় নাই – সে রোগ নেয় কি করে ?
২১৩. আত্ম-সুখ-দুঃখ গোপী না করে বিচার । কি নির্মল-উদার । কৃষ্ণ-সুখ-তরে । জগৎ ছাড়া ভাব – জগতে নাই । কৃষ্ণ-সুখ তরে করে সব ব্যবহার । আত্মসুখ তরে না করে বিচার । কৃষ্ণ সুখে সুখী ।
২১৪. আনন্দে সংসার করবে – নইলে সংসার বন্ধনের কারণ হবে । সংসার যেন বন্ধনের কারণ না হয় । বিদ্যার সংসার কর । অবিদ্যার সংসার বন্ধের কারণ । আমরা সংসারে মুক্ত হবার জন্য এসেছি । মালা-চন্দন পরতে আসি নাই । বিদ্যার সংসার কর – বন্ধনের কারণ হবে না ।
২১৫. তুমি সুখময় – তুমি সুখে থাক । আমি ভষ্ম হয়ে যাই – তাতে ক্ষতি নাই । তুমি সুখে থাক । হিংসা করতে নাই ।
২১৬. মায়া রাক্ষসী – মায়ার হাত থেকে কি এড়ান সহজ ? মায়া রাক্ষসী । মায়া রাক্ষসী এড়াইতে না পারলে-মরণ ।
২১৭. আনন্দের সংসার করবে – লাভালাভের দিক চাইবে না । গুরুর সংসার – সব সময়ই আনন্দে থাকবে । দেওয়া তাঁর নেওয়াও তাঁরই । লাভ-লোকসান গুরুর । লাভ-লোকসান আমার না । এ সংসার আমার না । আমার আঙ্গিনার ধূলিকণাও আমার না । লাভ-লোকসান গুরুর । বাধা না পর-সে দিকে লক্ষ্য রেখে সংসার কর । অবিদ্যার সংসার কর না । লাভালাভ গুরুর । আমার দুঃখ করার কিছু নাই । বিপদে অধীর হতে নাই । আমার কি বিপদ । আমার বিপদ নাই । লাভ-লোকসান আমার না । আমার বিপদ হবে কি করে গুরুর সংসার-লাভ-লোকসান গুরুর । আমার বিপদ নাই । সুখের স্পৃহা রাখবে না – বিপদেও উদ্বিগ্ন হবে না । এই ভাবে সংসার করবে । যেখানে আমি নাই – সেখানে তুমি আছ । যেখানে তুমি – সেখানে আমি নাই । নির্লিপ্ত সংসারী হও । নির্লিপ্তভাবে সংসার কর । এমন অনাশক্তি হয়ে সংসার করবে – লোকে বলবে – কি মোর সংসারীরে ! বুকে লাগবে না । বাইরে আশক্তি – মনে কোন কিছুতে মোহ নাই । এই ভাবে সংসার করতে হবে । বাইরে দেখতে যেন – খুব কর্মী । কিন্তু মনে পরিষ্কার – কোন কিছুতেই লিপ্ত নয় । এই ভাব নিয়ে সংসার করতে পারলে – জন্ম-মৃত্যু রহিত হবে । বর্হিদৃষ্টিতে ঘোর সংসারী – মন নির্লিপ্ত –মোহশূন্য ।
২১৮. দানেন প্রাপ্যতে স্বর্গম্‌ – দানেন প্রাপ্যতে শ্রীম্‌ । স্বর্গলাভ করতে ইচ্ছা থাকে – দান কর । দানেন প্রাপ্যতে স্বর্গম্‌ ।
২১৯. গুরুতে আত্ম-সমর্পণ করার আগেই বিচার – পরে আর বিচার করা চলে না । একবার গুরুতে আত্ম-সমর্পণ হলে – আর তার বিচার চলে না ।
২২০. দুঃখেষু অনুদ্বিগ্ন সুখেষু অনাশক্ত ত এব ধীরা । দুঃখে অনুদ্বিগ্ন সুখে অনাশক্ত তাঁরাই ধীরপদবাচ্য ।
২২১. তৎবিদ্ধি প্রণিপাতেন – পরিশ্রমেন – সেবয়া । তাঁহাকে জানতে হলে প্রণিপাত-পরিশ্রম-সেবাদ্বারাই সম্ভব ।
২২২. আব্‌ ভালাত জগৎ ভালা । আব্‌ বুড়াত জগৎ বুড়া ।
২২৩. পুত্র-কন্যার সেবা যত্ন পাওয়া ভাগ্যের কথা ।
২২৪. আমি জীব-কল্যাণের জন্য দেহ ধারণ করেছি । দেহের যা ভোগ – তা ভুগতেই হবে ।
২২৫. কামনাই জন্মের কারণ । কামনা নিয়ে সংসার কর । তাই পুনঃ পুনঃ জন্ম হয় । কামনা রহিত হলে, পুর্নজন্ম হবে না । আমার আচরণ দেখ -বাইরে বিষয়ী – মনে কিছু নাই – পরিষ্কার ।
২২৬. প্রারব্ধ কর্ম্ম-ক্ষণ আংশিক খণ্ডন হয়-ক্রিয়া আরম্ভ হয়ে গেলে । যেমন রাজা জন্মেজয় । মহাভারতে আছে – শাপগ্রস্থ জন্মেজয় – বিংশতি প্রকার কুষ্ঠ হবে তাঁর । কিন্তু এই এই কার্য্য করলে – রক্ষা পাবে । অনেক দানপুণ্য, যাগযজ্ঞ করে গুরু-সেবা, সাধু-সেবা কর – বিংশতি প্রকার কুষ্ঠের জায়গায় – ১৮ প্রকার কুষ্ঠ হয়েছিল । তার মধ্যে এক প্রকার কুষ্ঠ রয়ে গেল ।
২২৭. বিষয় বন্ধনের কারণ নয় । আশক্তিই বন্ধনের কারণ । বিষয় আশক্তিই বন্ধনের কারণ ।
২২৮. আমি মুক্ত পুরুষ – আমি আপন মনে ঘুরে বেড়াই । আমাকে ভক্তালয়ে আবদ্ধ করে রাখা সমীচীন না । আমি মুক্ত পুরুষ – আপন ইচ্ছায় চলি-ফিরি । কোন নিয়মের অধীন না ।
২২৯. করি করি করে – রজগুণের আশ্রয় । সত্য-গুণের যারা আশ্রয় লয় – পয়সা হয় না । ছলনা-কপটতা-মিথ্যা সত্য-গুণের যারা আশ্রয় লয়-পয়সা হয় না । ছলনা-কপটতা-মিথ্যা নাই-পয়সাও হয় না । এক টাকার জমি – একশত টাকা লাভে বিক্রী । এত টাকা লাভেরও একটা ধর্মাধর্ম আছে । মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে – টাকা হবে না কেন ? এক টাকার একশত টাকা লাভ । এত লাভ ধর্মের বিধি – বহির্ভূত । সত্যের আশ্রয় নিলে – এত অর্থ হয় না । অধর্ম্মের পথে বেশী টাকা হয় ।
২৩০. আপদে বিপদে – যদি মজে রামপদে, সম্পদে বিপদে – পদে পদে সকলই তাহার ।
২৩১. কৃষ্ণ-সুখে সুখী – ব্রজ গুপীর ভাব । শতেক কৃষ্ণ ঘরে থাক – দুঃখ নাই । কৃষ্ণ সুখে সুখী মোরা – ব্রজগুপীর ভাব ।
২৩২. এই জগৎ ভগবানের অধীন । তিনিইত জগৎ চালাচ্ছেন । ভগবৎ কৃপা ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়েনা ।
২৩৩. সন্দেহের তুল্য পাপ নাই – সন্দেহ করতেই নাই ।
২৩৪. ভাগ্যকে এড়াতে পারবে না । তোমার ভাগ্যে যা আছে – তা পাবেই । যা ভাগ্যে নাই – তা কিছুতেই পাবে না । নিজের ভাগ্যের দিকে চেয়ে থাক ।
২৩৫. দোনো নাহি মিলে – রবি রজনী এক ঠাই । যাহা রাম – তাহা কাম নাহি মিলে । যাহা কাম – তাহা রাম নাহি মিলে ।
২৩৬. মোর বিষয়ী । গুরুগত প্রাণ – গুরুতে আত্ম সমর্পণ – গুরুতে স্নেহ মমতা । ফুলই ছিটাইল – প্রসাদই খাইল – ঘণ্টিই লাড়ল বিশ বৎসর । বড়ই দুঃখের বিষয়ী – মোর বিষয়ী ।
২৩৭. তা মা ধা তিনটা বস্তুই দিতে হবে গুরুর চরণে । মন দেওয়া কঠিন । গুরু তখনই পাকা পাকি – যেদিন শিষ্য গুরুর চরণে তন মন ধন সমর্পন করে । রসগোল্লা খাও – খাইলে শিষ্যের শান্তিলাভ হয় – কৈলাসবাসী হইতে পারে । রসগোল্লা খাওয়াইয়া স্বর্গলাভ হইতে পারে । নির্বাণলাভ হয় না । আসা যাওয়া থাকবেই । আসা যাওয়া । এক রাজা রাজত্ব গুরুর চরণে সর্ম্পন্ন করে দিল । গুরু পাইয়া বলে –বাবা ! এই হাঙ্গামা আমি করতে পারব না । আমার রাজ্য আমার মনে কইরা তুমি রাজত্ব চালাও । আমাকে অনেকে বাক্স খুলে দেয় – বলে বাবা – যা খুসি নেন । আমি কি সব নেই ? আমি কি মুঠে মুঠে নেই ? বলি- যা নিয়া যা । আমি যা নিবার নিলাম ।
২৩৮. কৃষ্ণপ্রাপ্তি হবে কবে ? ‘আমি’ যাবে যবে !
২৩৯. সর্বতোভাবে দুঃখ নাশ করতে হলে – ভক্তি মহারাণী চাই । ‘আমি’ থাকতে ‘তুমি’ নাই । ‘তুমি থাকতে ‘আমি’ নাই । জোড়াতালি দিয়া হয় না । হিসাব কিতাব করে করতে হবে । ‘আমি’ নিয়া ‘আমি’। ‘আমি’ দিন দিন বড় হয়ে যায় । আমি ব্রজানন্দ প্রতিষ্ঠা করেছি । ঘুরে ঘুরে কাল মুখই দর্শন । দীক্ষা শিক্ষা সবই হয় – কাল বাঁদরের মুখই মনে পরে । একি জ্বালা – কাল মুখ বাঁদরের মুখই চোখে পড়ে । চরণ ধুলি মাখি – চরণামৃত খাই প্রসাদ খাই – ঘুরে ঘুরে কাল বাঁদরের মুখই । ঘর ছাড়লাম – বাড়ী ছাড়লাম – দেশ ত্যাগী হইলাম । সন্ন্যাসী হলাম – এক ঘর ছাইরা অন্য এক ঘরে আইলাম । আগে ছিলাম পাড়াগায় – তা ছাইড়া আইলাম মঠ মন্দিরে – আগে সাদা ধুতি চাঁদর এখন গেরুয়া – এখন মঠ মন্দিরে থাকি – ঘর ছাড়লাম কৈ ? ঘুরে ঘুরে ঐ কাল বাঁদরের মুখ । আগে ছিল সতীশচন্দ্র – এখন ব্রজানন্দ । ‘আমি, ছাড়লাম কৈ ? ছাড়লাম কি ? কিছুই ছাড়ি নাই । ঘুরে ঘুরে কাল বাঁদরের মুখ মনে পড়ে । তখন সাদা ধুতি – এখন গেরুয়া-ছাড়লাম ? ব্রজানন্দ শুকল – এখন স্বামী ব্রজানন্দ । কি ছাড়লাম ? আগেও আমি – পরেও আমি । হবে না ?
২৪০. ধর্ম করলে – ধন আপনিই হয় ।
২৪১. গুরুতে মানুষ জ্ঞান যেই জন করে সে জন নারকী – মনে দুঃখের সাগর ।
২৪২. ভক্ত আমার আপন জন । ভক্তের হৃদয় আমার বালাখানা ভক্তের হৃদয়ে আমার আসন পাতি ।
২৪৩. ব্রজানন্দের সংকল্প সত্য । ব্রজানন্দ যা সংকল্প করে – তা সত্যে পরিণত হয় । ব্রজানন্দের সংকল্প মিথ্যা হয় না । ব্রজানন্দের বেদধ্বনি ।
২৪৪. যার কেউ নাই – তার আমি আছি । পতিত পাবন ।
২৪৫. গুরুর সাথে সর্ম্পক রাখতে হয় – যেমন ছেলে – মায়ের সাথে । গুরুর প্রতি সেই রকম টান হওয়া চাই । গুরুর খোঁজ খবর করতে হয় ।
২৪৬. সুখে অহংকারে স্ফীত হবে না । সুখে দুঃখে সমান থাকবে । সুখে দুঃখে সমান ।
২৪৭. নিস্বার্থভাবে কর্ম্ম করবে । ফলের আশা করবে না । ফলের আশা না করে কর্ম্ম করে যাবে ।
২৪৮. ছয়টা সম্পত্তি আমাদের – টাকা পয়সা, জায়গা জমি ইত্যাদি । সম্পত্তি হল মনকে জয় করা – বাহ্য ইন্দ্রিয়কে দমন করা – সহ্য করা –সহিষ্ণুতা – সহনশীলতা – তিতিক্ষা – বেদান্ত বাক্যে বিশ্বাস – গুরুবাক্য বিশ্বাস ইত্যাদি ইত্যাদি ।
২৪৯. মানুষ দোষগুণে যুক্ত । দোষও আছে গুণও আছে । দোষ দেখে কাহাকেও উপেক্ষা করতে নেই । স্বামী দেবতা । দোষ করে এলেও পূজ্য । ধান দুর্বা দিয়া বইরা নিবে – এই স্ত্রীর ধর্ম । দোষ দেখে অবহেলা করবে না ।
২৫০. কামনা বাসনা জন্মের কারণ । কামনা বাসনা নিয়ে সংসার করি – তাই পুন পুন জন্ম হয় । কামনা রহিত হলে পুনর্জন্ম হবে না । আমার আচরণ দেখ – বাইরে ঘোর বিষয়ী – মনে কিছু নাই । পরিষ্কার ।
২৫১. ভাব আসা কি সহজ ? শিশুর মত সরল না হলে – ভাব হয় না । মন শুদ্ধ না হলে – ভাব হয় না – অভীষ্ট পূর্ণ হয় না ।
২৫২. যজ্ঞাবশিষ্টের অধিকারী যজমান – সর্ব প্রথম প্রসাদ পায় ।
২৫৩. বৈষ্ণবের মেয়ে বিয়ে দিয়ে – খোজ নেয় না । শ্বাশুরী বলে – বিয়ে দিয়া গেল – খবর নেয় না । মেয়ে পুনঃ পুনঃ পত্র লেখে বাপেরে । বাপে হরিনাম করতে করতে এল । বিয়াইন মূর্ত্তি দেইখা আশ্চর্য্য – দেইখাই অগ্নিঅবতার । রাত্রে একটা ভাঙ্গা ঘরে দিছে শয়ন করতে । তার পরে বৌকে জিজ্ঞাসা করে – বাবা কি নিয়ে এলেন ? বৌ উত্তর করে না, কাঁদে । পিতার কাছে গিয়ে বলে – কেন তুমি এলে আমাকে কাঁদাতে ? পিতার দুঃখ হইল শুনে । শ্রীহরি লক্ষ্মী বলেন – এর বাড়ী ভরে ভোগের জিনিষ – পত্র এনে দাও । লক্ষ্মী বৈষ্ণবের বাড়ী ভোগের মাল – পত্র এনে দিলেন বৈষ্ণব গ্রামের সবাইকে নিমন্ত্রণ করলেন । বৌর পিতা বৈবাহিকাকে বলেন – আপনার আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করুন । গ্রামের সকলেই সেবা করে ধন্য ধন্য – মহা কাণ্ড কারখানা । বৈবাহিকা আর লজ্জায় – ঘর থেকে বার হল না । বৈবাহিককে আর মুখ দেখান না । লজ্জায় ।
২৫৪. ভগবানের নামে যা অর্পন করা যায় – তা অমৃত হয়ে যায় ।
২৫৫. গোবিন্দের ভোগ – সব এক বারেই দিতে হয় । নিবেদন না করে গ্রহণ করি না । গোবিন্দের ভোগ – এক বারেই দিতে হয় সব । তা না হলে সব মিথ্যা । খাওয়া না ভোগ । গোবিন্দের ভোগ জানবে – খাওয়া মনে কর না – গৃহস্থের ভাব । আর দুটা অন্ন দেই – আর একহাতা ডাল দেই -গৃহস্থের ভাব । গোবিন্দের ভোগ এক বারেই সব নিবেদন করতে হয় ।
২৫৬. ছয় মাস যাবৎ মৃত্যু যোগ । যম আশে পাশে ঘুরছে ছয় মাস যাবৎ । মটর একসিডেন্ট মৃত্যু যোগ । পাকিস্থানী সৈন্যের দুইবার বন্দুক উঠান মৃত্যু যোগ । ছয় ছয়টি শিষ্যের একযোগে পাকিস্থানী সৈন্যের গুলিতে মৃত্যু-বরণ – যেমন তেমন ব্যাপার না । ঐ ছয় জনের কল্যাণের জন্য মনে হল – একটা শুদ্ধ অনুষ্ঠান – খাদ্যাদি প্রদান করতে হয় । উজারচর যখন ছিলাম ভারত প্রত্যাবর্ত্তন পথে – এই শুভ বাসনা মনে উদয় হয়েছিল । মনে পীড়া দিতে লাগল । পথে আঘাত পাইলাম । বিষয়টি চাপা পরল । এই এক মাস প্রেতাত্মা আবার পাছে আসা যাওয়া করে । একদিন দেখছি কোন প্রার্থনা নাই – একজন গোপাল ফুল নিয়া আসল । সে ফুল নিয়া আসল, মূলত তারে দেখলাম । মুকুন্দকে দেখলাম কাঁদছে । কি করব – এই দুজনাই দেখলাম ।
২৫৭. কর্মফল ভুগতে হবেই । তবে ঈশ্বরের নাম করলে যেখানে কাল সিঁধুত সেখানে ছুঁচ ফুটবে । ভোগ ভুগতেই হবে তবে ভগবানের নাম করলে এই হয় – যেখানে একজনের পা কেটে যাবার কথা ছিল সেখানে একটা কাঁটা ফুটে ভোগ হোল । ঈশ্বরের শরণাগত হলে তাঁর নিজের কলম নিজ হাতে কাটতে হয় ।
২৫৮. ব্যাধি ও তপস্যা একই জিনিষ; তপস্যা মত ব্যাধিতেও কর্মক্ষয় হয় ।
২৫৯. গুরুর কৃপা হলে কিছু ভয় নাই । গুরু জানিয়ে দেবেন তুমি কি তোমার স্বরূপ কি । কৃপা হলে হাজার বছরের অন্ধকার এক মুহূর্ত্তে দূর হয় । সদগুরু লাভ হলেই জীবের উদ্ধার ।
২৬০. সংসারে থেকেও জানবে এ আমার ঠিক ঘর নয় একটা বাধা মাত্র । শ্রীশ্রী ব্রজানন্দের পাদপদ্মই আমার আসল ঘর । যে কোন প্রকারেই হোক সেথায় আমাকে যেতে হবে । শ্রীবৃন্দাবনে মহানিশায় আধ্যাত্মিক তরঙ্গের প্রবাহ চলতে থাকে । সেই সময় সেখানে জপ, ধ্যান করলে প্রত্যক্ষ ফল পাওয়া যায় ।
২৬১. বিপদকে যে ভয় করে সে যেন ব্রজানন্দকে না ডাকে । যার উপর তাঁর যত কৃপা তার তত বিপদ জানিও ।
২৬২. গুরুশক্তি । যিনি আশ্রয় দিয়েছেন তিনি কোন কালে রুষ্ট হন না । গুরু ইষ্ঠ এবং নিজেকে এক বলে জানবে । ইষ্ট ও জীবাত্মা একই জ্যোতির দুই মূর্ত্তি ।
২৬৩. মায়ায় আবদ্ধ হইওনা । আমাকে সাথী করে সব করবে । সংসার করবে ব্রজানন্দের সংসার । সে সংসার হবে ত্যাগীর সংসার ভোগীর সংসার নয় ।
২৬৪. ভক্ত আমার প্রাণ । ভক্তকে রক্ষা করা আমার ধর্ম; ভক্তের মুক্তি আমার জীবন বেদ । শান্তি আশীর্বাদ অমোঘ । অশান্তি থাকে না ।
২৬৫. আমার এই আসন হতে ও যাহা পাবে, আমা হতেও তাই পাবে । জীব জগতের কল্যাণের জন্যই আসন প্রতিষ্ঠা । আসনই অনন্তকাল থাকবে ।
২৬৬. গুরুর অধিক আর কেহ নাই; গুরু সর্বেশ্বর, সকলের নিয়ন্তা ও নির্বাহ কর্ত্তা । তোমরা এই বোধে নাম কর, ধ্যান কর, গুরু চিন্তাকর, দর্শন কর, জপ কর, সেবা কর, পূজা কর, উপাসনা কর । তোমাদের অভীষ্ট লাভ হবেই । অভাব রাক্ষসটীর তাড়না সহ্য করিতে হইবে না । কামনা বাসনা পূর্ণ হইবে । বিপদ আপদ রোগ শোক দুঃখ কষ্ট দূরে যাবে । সাপে বাঘে খাইবে না । তোমরা সরল বিশ্বাস নিয়া দিনান্তে একবার অন্ততঃ জয় ব্রজানন্দ বলে আমাকে স্মরণ করিবে ।
২৬৭. এ অনিত্য দেহ । তাই তোমাদের নাম দিয়েছি । নাম ধর পার হবে ।
২৬৮. আমাকে দেয় পূজা বা ভক্তি আমার আসনে বা ফটোতে দিলে আমিই পাবো । ভক্তের প্রাণের পিপাসা মিটানোর জন্যই আমার এ অবতার ।
২৬৯. গুরুকে দ্বারমে কুত্তেকে মাফিক পড়ে রহো কুকুরের মত আমাদের প্রভুর দ্বারে একনিষ্ট ভাবে তাঁর শরণাগত হয়ে পড়ে থাকতে হবে । যে শেষ পর্যন্ত তাঁর আশ্রয়ে পড়ে থাকতে পারবে, তার উদ্ধার ।
২৭০. ব্রজানন্দই দুর্গা, কালী, রাম, শিব, শ্রীকৃষ্ণ আবার ব্রজানন্দই সেই নির্বিশেষ শুদ্ধচৈতন্য ।
২৭১. গুরু শিষ্যের সম্বন্ধ পারমার্থিক পিতাপুত্রভাব । সর্বস্ব অর্পন করিলেও গুরুর ঋণ শোধ করা যায় না ।
২৭২. গুরুতে যার সাক্ষাৎ ভগবান বলে বিশ্বাস, তার জন্ম শেষ । যে দিন গুরু মন্ত্র দেন সে দিন পুনর্বার জন্ম হয় এবং পূর্বের যত পাপ সব ধ্বংস হয়ে যায় । গুরুই সমস্ত পাপ গ্রহণ করেন ।
২৭৩. তোমরা আমার নাম ধর । আমি ও আমার নাম একই বস্তু । আমাকে দেয় পূজা বা ভক্তি আমার আসনে ফটোতে দিলে আমিই পাবো । সেখান হইতেই তোমাদের অভিষ্ট পূর্ণ হবে । নামের ভেতর দিয়েই তোমাদের অভিষ্ট পূর্ণ হবে । আমি তোমাদের কোন কিছুই অপূর্ণ রাখি নাই । সব কিছুই পূর্ণ করে দিয়াছি ।
২৭৪. শ্রীচরণই যখন তোমার একমাত্র সম্বল তবে তো তোমার তরী ভব সাগর হতে সব চেয়ে আগে পাইয়াছে । আর চিন্তা কি, নির্ভায় ও নিশ্চিন্ত থাক । পারের তরীতো পেয়েছ ।
২৭৫. যতক্ষণ বলতে পার – ততক্ষণই লাভ । কতকাল সংসার করছো ? এর কি শেষ নেই ? যার শেষ নেই – তার পাছে ছুটে লাভ কি ?
২৭৬. পাপ নিঃশেষ করে যাও । সুখ-শান্তিতে সংসার ভরপুর হবে ।
২৭৭. ঠেকা-ঠেকি পরলেই আসবে । জীব-কল্যাণের জন্য গোলকধাম প্রতিষ্ঠা হল । ঠেকা-ঠেকি উদ্ধার হবে ।
২৭৮. চরণে শরণ লও দিনান্তে একবার । স্মরণ করো – যমে ছোঁবে না । জগৎ-উদ্ধারণ নাম-ব্রজানন্দ ।
২৭৯. মুক্তিদাতা গুরু । মোক্ষপদ পাওয়াতে পারে একমাত্র গুরু । গুরু সবচেয়ে আপন । তাঁর চেয়ে আপন আর কেহ নেই । পিতামাতা পালনীয় – পোষ্যবর্গ, পালন করতে হয় । গুরু ও পোষ্যবর্গ পালন করতে হয় । যেমন পিতামাতাকে পালন করতে হয় । গুরোণোধিকম্‌ । গুরুর অধিক আর কেহ নাই ।
২৮০. বিদ্যা, ধন যদি সৎপাত্রে পড়ে – তবে অভিমান হয় না । বিদ্যার অভিমান, ধনের অভিমান – এই বিদ্যার, ধনের দোষ । ধর্ম ভিন্ন ধন ও বিদ্যা দুইই অকর্ম্মণ্য ।
২৮১. ঠাকুর দিলেন প্রসাদ-সন্দেশ । ভক্ত নিয়ে গেল ঘরে । দেখে সন্দেশে-হরি । প্রসাদস্তু ভগবান স্বয়ং । ও-কি-দুই ।
২৮২. বাল্মিকী মহা পাতকী – যার মুখে রামনাম উচ্চারণ হয় না । তার সমস্ত পাপ ক্ষমা হয়ে গেল । কবে যে লীলা করে গেছে – আজ হিন্দুর ঘরে ঘরে তাঁর গুণগান । আজ বাল্মিকী-মুনি ।
২৮৩. তোমার শুদ্ধ দেহ – নির্মল দেহ – পবিত্র দেহ । তোমার কোন পাপ নেই । সব পাপ যায় নামে । তোমার কোন পাপ নেই ।
২৮৪. অন্ধ অন্ধকে পথ দেখাতে পারে না – সে অন্ধকার দূর করতে পারে না । বিবাহের পূর্বের দীক্ষিত পাত্র-পাত্রী-ভিন্ন গুরু । বিবাহের পরে স্ত্রী স্বামীর গুরুর নিকট দীক্ষিত হবে । স্বামীর গুরুই স্ত্রীর গুরু হবেন । উভয়ের নাম শুনেই অনুরাগ । উর্বর ভূমি । কারও দেখেও অনুরাগও হয় না -কারও নাম শুনেই অনুরাগ ।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে মন যথা গিয়ে রয়,
সে যে পরম গুরু জানিবে নিশ্চয় ।

২৮৫. নাম গুরুরই আর এক রূপ ।
২৮৬. স্বামী মহাজন । মহাজন যেন গত স পন্থা । স্বামীর পথইত অনুসরণ করতে হবে । স্বামীর গুরুইত স্ত্রীর গুরু হবেন ।
২৮৭. পুনরপি জন্‌নম পুনরপি মরণম্‌,
পুনরপি জননী জঠরে শয়নম্‌
সারাদিন ভাবনা-চিন্তা-কি খাব ? মানুষত মুক্তি চায় না ।

২৮৮. নাম মুক্তি খোঁজ । কানা পোলার নাম-পদ্মলোচন ।
২৮৯. কবির উপাখ্যান । কবির ছিল মুসলমান জোলা-কাপড় বুনত । রোজ এক জোড়া বিক্রয় করে সংসার চালাত । একদিন বাজারে এক জোড়া কাপড় লয়ে গেছে বিক্রয় করতে । এক বৈষ্ণব বলে “আমার দরকার” । কবির বৈষ্ণবকে দিল একখান এই মনে করে – মহাভাগ্য । একখান বস্ত্র দান করে বৈষ্ণবকে বৈষ্ণব বলে – দুইখানাই দেও । একখানা পড়ব, আর একখানা ভিজাব । কবির দুইখানাই কাপড় দিল এখন খালিহাতে ভয়ে আর বাড়ী যেতে পারে না । সন্ধ্যায় জঙ্গলে এক মন্দিরে শয়ণ দেয় । বাড়ী গেল না । এদিকে ভক্ত – অভুক্ত, কোথায় না খেয়ে শুয়ে থাকবে – হরি নিজে ব্রাহ্মণের বেশে গাধার পিঠে বস্তা বহে চাল ডাল নিয়ে গেল ভক্তের বাড়ী । এই দেখে কবিরের বাবা মনে করে “এত চাল-ডাল ছেলে কোথা পেল ? লোক পাঠিয়ে কবিরকে খুঁজে আনা হল । কবির মনে করে – হরি ভক্তের কষ্ট সইতে না পেরে, ভক্তের সব অভাব পূরণ করতে দয়াময় নিজে এসেছেন । ভক্তের ভগবান হরি – ভক্তের দুঃখ সইতে পারে না । কবির হরিভক্ত মুসলমান ।
২৯০. ধর্ম ছেড়ে দিলে – দুঃখত সবই । অধর্ম ছেড়ে দাও-দুঃখ দূর হবে, অবশ্য দূর হবেই । চোখে আঙ্গুল দিয়ে না বুঝালে বোঝ না । আমাকে দেখে বুঝে লও । আমারে দেখে বুঝে লও ।
২৯১. দুই রাজা – সোনার পুরী ছারখার করে দিল । ধর্মবল না থাকলে সব মিথ্যা । সাব্ধান-খবরদার । ঐ দেখ আমার আর এক রাজ্য । রাজা ধর্ম বলে বলীয়ান । আমার ধর্মের জোর জোয়ার হচ্ছে ওর মনের উপর । এই জায়গাই এই ছাড়া জায়গা নেই । রাজা ধর্মবলে বলীয়ান ।
২৯২. আমি তোমাদের জন্যই আছি – নরদেহে । নিজের কোন প্রয়োজন নেই – তোমাদের জন্যই এসেছি প্রার্থনা দিয়েছ ঠিক জায়গায় । দর্শন রাখ মনে, সবকিছু হবে । ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ চতুবর্গ ফললাভ হবে । ছোঁয়া মাত্র হয়ে গেছে । সাধু স্পর্শমণি । ছোঁয়ালেই সোনা ।
২৯৩. শুকদেব যেই মাটিতে পড়লো – ওমনি দৌড় । বাবা বলেন -আয়-আয়-কোথা যাচ্ছিস ? শুকদেব বলে না বাবা – আমার হয়ে গেছে । বনমুখী চলল । সেই রকম কোথায় ?
২৯৪. ভজ ভজ ভজ ভাই শ্রীগুরুর চরণ – মদ মোহ ছাড়ি লও শ্রীগুরুর স্মরণ । গুরুর চরণ সংসারের মুখরূপী । খোলা সংসার গলার ফাঁসী । সংসার রূপ গলার ফাঁসী খোলা যায় না, শ্রীগুরুর চরণ-স্মরণ লও ।
২৯৫. সংসারের বাঘ – ভালুকের চেয়ে বনের বাঘ – ভালুক ভাল । বি, এ, এম্‌, এ পাশ । গলা কাটে । এই বাঘের চেয়ে বনের বাঘ – ভালুক ভাল । কান কাটে-নাক কাটে-চোখ উপড়ে ফেলে । সব শিক্ষিত লোকের কার্য্য । বনের বাঘ-ভালুক আর কি !
২৯৬. সন্দেশ-প্রসাদের সঙ্গে প্রসাদি ফুল । ফুলের মধ্যে পাওয়া গেল হরিতকী একটি ।
২৯৭. এক ব্রাহ্মণ কন্যা-দায়ে একেবারে পাগল-পারা । দুই মেয়ে – গৃহে অর্থশূন্য – কি করে ? বিশ্বনাথের মন্দিরে হত্যা দেয় । অর্থশূন্য গৃহ – তুমি ছাড়া এই দুঃখ মোচন করবে কে ? বিশ্বনাথ আদেশ করলেন । যা বৃন্দাবনে সনাতন ঠাকুরের কাছে গেল কাশী থেকে বৃন্দাবন । টাকা দাও -কন্যাদায় মুক্ত হই । সনাতন ঠাকুর বলেন – আমি সব টাকা ছেড়ে ফকির হয়েছি । আমার কাছে টাকা নেই । ব্রাহ্মণ বলে – তবে বিশ্বনাথে আদেশ মিথ্যা হবে ? এই কথা শুনে সনাতন ঠাকুরের মনে হল পরশ সাহেবের কথা । এনে দিল স্পর্শমনি । মাথা ছোঁয়ালে লোহা সোনা হয় । একমন লোহা ছোঁয়ালে একমন সোনা হয় । তখন ব্রাহ্মণ ভাবে হায় ! হায় ! এর চাইতেও আরও বড় জিনিষ আছে, যা চাইতে হয় । তখন ব্রাহ্মণ বলে সনাতনকে – যে ধনে হইয়া ধনী, মণিরে মাননা মণি – আমি চাই তার এক কণা । এই বলে স্পর্শমণি ফেরৎ দিল সনাতন ঠাকুরকে । স্পর্শমণি ফেরৎ লও । তুমি যে ধনে ধনী তার এক কণা আমাকে দেও । আমার কাছেও এই রকম ৫/৭ টি সাধু ছিল ।
২৯৮. যে যার গুণ জানে না – সে তা তুচ্ছ মনে করে । যেমন গজমুক্তা তুচ্ছ করে – গুঞ্জনফলে পরিত্যাগ করে । গজমুক্ত কি চিনবে – ইচ্ছা করে ফেলে দেয় – পরিধান করে না । গুঞ্জনফল গলায় ধারণ করে – হাতে ধারণ করে ! মুক্তা পরিত্যাজ্য – গুঞ্জনফল মহা মূল্যবান । হাতি মরে থাকে -চিনে না গজমুক্তা – গজমুক্তা ফেলে দেয় । পরিধান করে না ।
২৯৯. ভক্তের কষ্টোপার্জিত পয়সা – যা ভক্তরা দেয়, যথোচিত ব্যবহার করতে হয় ।
৩০০. এক হাজার অমৃতের তুল্য – স্বাস্থ্য যদি ভাল থাকে – এক হাজার অমৃতের তুল্য হাজার নিয়ামত । স্বাস্থ্য সুখের নিধান । এক তুলসী হাজার নিয়ামত ।
৩০১. আমি কভু আমার না । করি এক, হায় আর । মানুষের সর্ব ধুলিসাৎ ।
৩০২. এতদিনের বুড়াশিব লোকালয়ে ছিল । লোকালয় গিয়ে জঙ্গলে পরিণত হল । আমরা এসে আসন পেতে জাগাতে লাগলাম । হাজার হাজার যাত্রীর ভিড় । চিরকালের বুড়াশিব চিরকাল থাকবে । দেখ কি কাণ্ড হয়ে গেল ? এই যে আমার বাক্য – আমি কভু আমার না । করি এক, হয় আর ।
৩০৩. এমন একটা অমানুষিক অবিচার হয়ে গেল – আশ্চর্য্য, অভূতপূর্ব । সমানে গুলি । বাছাবাছি নেই । একধার দিয়ে অত্যাচার । কিন্তু জান্‌ গিয়া । ফুল-চন্দন ছিট্‌কে মোর ঘুরাদে ।
৩০৪. গ্রন্থ প্রতিপাদ্য প্রকৃত বিদ্যালাভ হইতে অনেক দূরে । গ্রস্থ প্রতিপাদ্য বিষয়- বিদ্যালাভ । যে বিদ্যাতে আত্মবিকাশ, আত্মজ্ঞান লাভ হয় না -সে বিদ্যা বিদ্যাই না ।
৩০৫. মানুষের ধৈর্য্য চাই । ধৈর্য্য না থাকলে মানুষই না । ধৈর্য্য ধরে থাক – আমি আছি পাছে পাছে ।
৩০৬.
আটখানা রুটির ইতিকথা
‘শিবোহহম্‌-শিবোহহম্‌-শিবোহহম্‌’, – দিব্যকান্তি বিশিষ্ট, জ্যোতির্ম্যয়, সৌম্যদর্শনধারী এক নবীন সন্ন্যাসী উপস্থিত হলেন পাঞ্জাব প্রদেশের এক গৃহস্থের কুটিরে । গৃহস্বামিনী গৃহাভ্যন্তরে ব্যস্ত ছিলেন গৃহকর্মে, তাড়াতাড়ি ছুটে এলেন গৃহদ্বারে, এসে চেয়ে দেখলেন- দর্শন করলেন দু’চোখভরে দর্শন করলেন কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত শূলপানি কমগুলুধারী সর্বত্যাগী এক সন্ন্যাসীকে – মন বারবার বলছে এযে সাক্ষাৎ দেবাদিদেব মহাদেব তারই গৃহপ্রাঙ্গণে আজ আবির্ভূত । আনন্দ সাগরে ভাসতে ভাসতে গৃহকর্ত্রী ভুলেই গেলেন এই সর্বত্যাগীকে যথাহিত অভ্যর্থনা করে আসন পেতে দিতে । ভক্তিমতীর তন্ময় অবস্থা কাটানোর জন্য দিব্যলোকের অধিকারী আগন্তুক সন্ন্যাসী আবার সেই কম্বুদকণ্ঠে – স্নেহভরা সুরে বলে উঠলেন, – ‘কিছু খানা চাই মাঈজি !’ যাঁর ধামে কোন কিছুরই অভাব নাই, যাঁর রাজ্যে অন্নপূর্ণ স্বয়ং বিরাজমান সেই কৈলাসপতির আজ দীন ভিখারীর বেশ ! এদিকে গৃহস্বামিনীর মনে চিন্তা, ঘরে আছে বাসী রুটি কয়েকখানা মাত্র । তাহাতো এই পরম পুরুষ্কে দেওয়া যায় না । তাতে যে গৃহস্থের অকল্যাণ হবে । ভক্তিমতী পাঞ্জাবী মহিলাটি সন্ন্যাসীর জন্য যথা শক্তি আহার্য প্রস্তুত করলেন । অন্যান্য আহার্যের সাথে সন্ন্যাসীর ভোগে তুলে দিলেন কয়েকখানা সদ্য তৈরি রুটি । ভোক্তা তুলে নিলেন আটখানা রুটি । এই আটখানা রুটি কি ? না-শিবতন্ত্রানুসারে ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, মান, ক্রোধ, মোহ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা – মোট এই আটটি পাশ – যা জীবের মুক্তিপথের প্রধান অন্তরায় বা বাধা । করুণাবতার বুড়াশিব ব্রজানন্দ ভাগ্যবতী মহিলাটির এই আটটি পাপ মুক্ত করে তাকে মুক্তি দিলেন – সত্যম্‌-শিবম্‌-সুন্দরম্‌ – এর আনন্দালোক কৈলাস ধামে ।
৩০৭. ভক্ত যার আগে আগে, আমি যাই তার পাছে পাছে । শেষের দিনের সাথী আমি । শেষের দিনের সাথী আর কেহই হ’বে না ।
৩০৮. সাত কুয়ার জল খেওনা; এক কুয়ার জল খেও । ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে এক কুয়ার জল খেও, তবেই সব হ’বে ।
৩০৯. ধর্ম ভিন্ন বিদ্যা, ধন অকর্মন্য । ধর্ম ভিন্ন বিদ্যা অবিদ্য; ধর্ম ভিন্ন ধন নিরর্থক ।
৩১০. অভিমান সুরাপান । সাধুর ধর্ম অভিমান শূন্য হওয়া ।
৩১১. স্বাস্থ্য সুখ অমৃত তুল্য । স্বাস্থ্য সুখ না থাকলে সব বৃথা । স্বাস্থ্য বিনা ধন জন কিছু না ।
৩১২. প্রসাদে হরি – ভক্তির উদয় হয় ।প্রসাদস্ত ভগবান্‌ স্বয়ম্‌ । প্রসাদে সর্ব দৃঃখাণাঃ হানিঃ ।
৩১৩. পরিষ্কার করে এসেছি, কিছু রেখে আসিনি । ভাঙ্গা-গড়া আমার স্বভাব । একবার ভাঙ্গি একবার গড়ি । আমার স্বভাবই এই ।
৩১৪. তোমার আমার একই । আমার মনে থাক বা না থাক, তোমার মনে থাকলেই হইল ।
৩১৫. গুরুদেব বিনা নাহি ভাগ জাগে । গুরুদেব বিনা ভাগ্য জাগাইবার কারও শক্তি নাই । বন্দুকের হাত থেকেও প্রাণ বাঁচে, গুরুর নামে ভূত পালায় ।
৩১৬. রাজ ধর্ম প্রজা-পালন, প্রজা পীড়ন নয় । রাজ ধর্ম পালন না করে অসুর বৃত্তি । এই হ’বে ধবংসের কারণ । যুগে যুগে তাই হয়েছে ।
৩১৭. ভাগ্য কামাই কইরা না আইলে ভাগ্য – পাওয়া যায়না । ভাগ্য কামাই করতে হয় ।
৩১৮. পথে মন্দির, আশ্রম, বিল্ববৃক্ষ, বটবৃক্ষ উলঙ্গন করে যাওয়া অশুভ লক্ষণ ।
৩১৯. আমার ইচ্ছার সাথে তোমার ইচ্ছা মিলাও । ফল আশু হবে । ভক্ত দিয়াই ভগবানের পরিচয় । আমার চেয়ে আমার ভক্ত বড় । আমার কি মূল্য আছে ? আমার চেয়ে আমার ভক্ত বড় !
৩২০. নাম মহৌষধি । নামে রোগ সারে । নামে ভক্তির উদয় হয় ।