বাণী কনিকা

অভেদ উপাসনা

১. জীবসঙ্গে আপন আত্মা পরমাত্মার স্বরুপ, এই অভেদ উপাসনা । এই উপাসনায় জীব সকল সিদ্ধি লাভ করিতে পারিলেই পরস্পরে বিবাদ বিসম্বাদ, হিংসা দ্বেষ থাকিবে না । জীব সকল শান্তি লাভ করিবে, অশান্তি ভোগ করিতে হইবে না । আমি এই জ্ঞান জীবের অন্তরে প্রকাশ করিয়া সর্ব্ব অমঙ্গল দূর করিয়া মঙ্গল স্থাপন করিব । মা, এই সত্য জ্ঞান নিজে আনিয়া অপরকে মানাইয়া মঙ্গল কর । জীব মাত্রকে আপনার আত্মা পরমাত্মার স্বরূপ জানিয়া সকলের উপকার করাই স্বাভাবিক ধর্ম্ম জ্ঞানী পুরুষের । যাহার পরমাত্মারূপী গুরুতে নিষ্ঠা ভক্তি আছে তাহার জীব মাত্রেই দয়া সমদৃষ্টি আছে । মা, তুমি কোন বিষয়ে চিন্তা করিওনা । তুমি আপনাকে ও আমাকে এক স্বরূপ দেখ । আমি নির্গুণ নিরাকাররূপে এবং সগুণ সাকার রূপে চরাচর বিস্তার আছি । আমা হইতে দ্বিতীয় কেহ নাই । এই সংসারে সব উপাধিই আমার অথচ কোন উপাধিই আমার নয় ।

২. সন্ধ্যা আহ্নিক করিবার কালে প্রার্থনা করিবে ঠাকুর আমি তোমারই স্বরূপ তুমি ও আমি এক বস্তুই । মায়া মোহে আবদ্ধ হইয়া আজ আমরা তোমা হতে পৃথক হয়ে গেছি । এক্ষনে তুমি আমাদের তোমার করিয়া লও, তোমার নিত্য, সত্য স্বরূপ আমায় দাও । মাই তোমরা এইভাবে গুরুকে সাধন করিয়া যাও । তোমাদের উভয় লোকেই মঙ্গল ।

৩. মায়ার ফাঁদে পড়ে তোমার নিজ স্বরূপ হারায়ে ফেলেছ । এক্ষনে চিন্তা করে সেই স্বরূপ লাভ কর ।

৪. তোমারসর্ব্বত্রগুরুজ্ঞানহউক । এইজগতেসর্ব্বত্রইএকমাত্রগুরুদেবেরইলীলাখেলা । একমাত্রব্রজানন্দইজগৎব্যাপিয়াআছেন । এইজগতেযাকিছুসবই “ব্রজানন্দ” । গুরুময়ভূমন্ডলতশুনেথাকবে ? কাজেইদেখতোমাতেওগুরুতেকোনপার্থক্যনাই । তুমিওযাগুরুওতা । একভিন্নদুইনাই । তবেযেদুইদেখাচ্ছেমায়াতে । যেইআমিসেইতুমি । তুমিআমিতেকোনভেদনাই ।

৫. মন্ত্রেতুমিদীক্ষিত । তোমারস্বরূপওশ্রীগুরুদেবেরস্বরূপএকভেবেধারনাকরেতবেজপকরিবে । শেষেদেখতেপাইবেগুরুশিষ্যএকইবস্তু । মায়াতেদুইদেখায় । সেইমায়াঅপসারিতহবেজপকরিতেকরিতে । তাকেইবলেআমিতুমিমিলনভূমি, তখনইআমিতুমিরমিলনভূমিতেদাঁড়াব । একত্বজ্ঞানলাভহবে । তখনআমিওনাইতুমিওনাই, কেকারখোঁজলইবে ? একেইবলেনির্ব্বিকল্পসমাধি । গুরুওনাইশিষ্যওনাই । মহাজনবাক্যেওআছে-“সেবড়কঠিনঠাঁই ! গুরুশিষ্যেদেখানাই” তখনযাথাকেতামুখেবলাযায়না । এইচরমঅবস্থায়নাযাওয়াপর্যন্ততুমিওআছআমিওআছি । তোমারওকর্তব্যআছেআমারওকর্তব্যআছে । তুমিওডাকাডাকিকরবেআমায়, সেবাপূজাদেবেআমায় । আমারওকর্তব্যপ্রাণখুলেআশীর্ব্বাদকরা, সেবাগ্রহণকরা । তুমিফটোরকাছেরোজইঘরেযাকিছুথাকেপেঁরা, বাতাসা, ফলমূলভোগদিবে । আরবর্তমানেতআমিইরয়েছিঅন্নব্যঞ্জনযাদিতেহয়গুরুধামেইব্যবস্থাকরেদিবে । তোমারঅম্বুবাচিকরবারআরপ্রয়োজনকরেনা । অম্বুবাচিরকয়দিনশ্রীগুরুদেবেরকাছেভোগদিয়াপ্রসাদখাইয়ালবে । শ্রীগুরুরপাদপাদ্মতিলতুলসীদিবে । শ্রীগুরুরচরণে-১২ মাসইবেলপাতাদেওয়াচলে । তুমিশুধুআমারএইজনমেরআপনজননও । তুমিআমারপূর্ব্বজন্মেরওআপনজন । দিনান্তেনামটাআমারএকবারস্মরণকরিও । তবেইতোমারবিশ্বাসভক্তিক্রমেইবারবে ।

৬. আমি তো তোমাদের সেই অভেদ উপাসনাই দিয়াছি “সোহহম্‌” আমি সেই, এই ভাবনা নিয়া নাম, জপ, ধ্যান ইত্যাদি করিবে, তাহা হইলে আমাকে তোমাতেই পাইবে । ব্রজানন্দ অভিন্নরুপে তোমাতেই বিরাজ করিতেছেন । সেই তো চিরমিলন, সেখানে বিচ্ছেদ নাই । দেহের দর্শন, মিলন এ তো মিথ্যা, আজ আছে কাল নাই । তখন কি আবার আর এক গুরু করবে ? বাবা ক্ষণিকের উপাসনা দূর কর, সে তো দুঃখের কারণ । সে ভাবে আমার উপাসনা করিবে না । আমি তোমাদেই আছি এই বোধে আমার উপাসনা কর । ত্রিকালেও ব্রজানন্দের অভাব বা বিচ্ছেদ যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবে না ।


ব্রজানন্দ বেদবাণী
প্রমথ মিত্র

[ ভগবান ব্রজানন্দের দৈনন্দিন উপদেশবাণী হতে সংগৃহীত ।
কথ্য ভাষা হতে লিখিত ভাষায় রূপান্তরিত মাত্র । ]

১. সত্যাশ্রয়ী হও । সত্যই জ্ঞানের উৎস – শক্তির অংকুর – নিষ্ঠার হেতু – তৃতীয় নয়ন ।
২. সত্য-প্রেম-পবিত্রতা-ভক্তি-বিশ্বাস, সংসার জীবন, ধর্ম-জীবন সহজ সরল সুন্দর করে ।
৩. দেব দর্শনে পাপ ক্ষয় হয়, অমঙ্গল দূর হয় । ভক্তি-বিশ্বাস নিয়ে দর্শন করতে হয় ।
৪. শরণাগত প্রতিপালক । যে আমার শরণ নেয় – আমি তার প্রতিপালন করি ।
৫. ভক্ত আমার প্রাণ – ভক্তকে রক্ষা করা আমার ধর্ম্ম – ভক্তের মুক্তি আমার জীবন বেদ ।
৬. ব্রজানন্দ মানুষ-ভগবান । ভক্তি-বিশ্বাস-অনুভূতি চাই । যদি আর কিছু মনে কর, মহাভুল করবে ।
৭. ভগবান জগতের একমাত্র নিয়ন্তা, নির্বাহ কর্ত্তা । ব্রজানন্দ জীবন্ত ভগবান । দর্শন ঠিক রাখ । অন্যকিছু ভেবোনা ।
৮. মাতৃভক্ত হ’লে সংসার স্বর্গরাজ্য হয় । মাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করবে ।
৯. ব্রজানন্দ মহাকালী । ভক্ত নানাভাবে আমাকে দর্শন করে । যার যেমন ভাব । কখনও শ্যামা – কখনও শ্যাম – ব্রজানন্দ শিব – রাম ।
১০. এক কথায় সর্ব্ব ধর্মের সমন্বয়ে ব্রজানন্দ ধর্ম । ধর্মের সমন্বয় সাধন ব্রজানন্দের আবির্ভাবের হেতু ।
১১. আমি তুষ্ট হ’লে তোমার ইহকালে সুখ – পরকালে পরামৃত লাভ ।
১২. মায়ায় আবদ্ধ হইওনা । আমাকে সাথী করে সব করবে । সংসার করবে ব্রজানন্দের সংসার । সে সংসার হবে ত্যাগীর সংসার – ভোগীর সংসার নয় ।
১৩. হিংসা-দ্বেষ বর্জিত-প্রাণ শান্তির প্রসবন । হিংসা – দ্বেষ বর্জিত হও ।
১৪. কর্মই বন্ধন । কর্ম-বন্ধন মুক্ত হও । কর্ম থাকতে উদ্ধার নাই । কর্ম ক্ষয় কর – মুক্তি করায়ত্ত্ব হবে ।
১৫. বৈদ্য নারায়ণ হরি – তার শরণ লও । রোগমুক্ত হ’বে ।
১৬. জ্ঞাতা-জ্ঞান-জ্ঞেয় সবার উপরে ব্রজানন্দ ভগবান ।
১৭. বর্ত্তমান শিক্ষা সভ্যতা তামসিক । অহং প্রতিষ্ঠা ।
১৮. রাজধর্ম প্রজা পালন, প্রজাপীড়ন নয়, অসির বলে শাসন নয় ।
১৯. নাম কর।নামের মধ্যে সব কিছু আছে । আমার কাছে যা আছে নামের কাছেও তাই আছে । নাম অক্ষর বিশেষ মনে করোনা, নাম মূর্ত্তিমান মনে রাখবে ।
২০. শান্তি আশীর্বাদ অমোঘ । অশান্তি থাকে না ।
২১. নাম নামি অভেদ । নাম নিয়ে থাকতে হয় । আমাকে যা দিবে নামের কাছে দিলেই আমি পাই । গুরুতো চিরদিন থাকে না । নামই চিরসত্য, নাম কর । নাম নামি অভেদ ।
২২. আমা হতে যা পাবে এই আসন হ’তেও তাই পাবে । জীব-জগতের কল্যাণের জন্যই আসন প্রতিষ্ঠা । আসনই অনন্তকাল থাকবে ।
২৩. শক্ত করে বাক্য ধর সত্বর ফল পাবে, ভক্তি-বিশ্বাস নিয়ে বাক্য পালন করবে ।
২৪. ব্রজের ভাব-ভক্তি তোমার আদর্শ । এর কাছে আর কোন ভাব-ভক্তি লাগে না । যশোদার স্নেহের পুতুল । সেখানে আর ভগবান থাকে না । বাৎসল্যভাব ।
২৫. বেদে নাই ভাগবতে নাই । ব্রজের ভাব-ভক্তি সবার উপরে, তুমি আমার আমি তোমার । ওঁ পরমাত্নণে নমঃ ওঁ ব্রজানন্দায় নমঃ তস্মিন তুষ্টে জগৎ তুষ্ট ব্রজের ভাব ।

গুরু-শিষ্য সংবাদ
(শিষ্য তরণীকান্ত বসুকে লিখিত গুরুদেবের পত্রের অংশ)

২৬. শিষ্যঃ- বাবা, সংসার বড় বিষম স্থান । বাত্যাতাড়িত তরণীর মত মন সততই চঞ্চল; গন্তব্যস্থলে পৌছান বড়ই দুষ্কর । আমার ভক্তিও নাই; মানসিক শক্তিও নাই । কি করা কর্ত্তব্য ?

উত্তরঃ-আমার সব কিছু বরণ করে নিলেই তোমার ভক্তি অচলা হয়ে যায় । আমার ইচ্ছা সাথে তোমার ইচ্ছা মিলে গেলেই হয় । তোমার প্রকৃতির সাথে আমার প্রকৃতির মিল থাকলেই তা হয়ে যায় । আমার সব কিছুই তোমার মিঠা লাগা চাই, তা হলেই যে কোন সংশয় থাকে না । ভক্তি অচলাই থাকে, বিশ্বাস টলে না । বিশ্বাস অটুট রাখতে হ’লে Complete Surrender করতে হয় (সম্পূর্ণ শরণাগতি) । নিজের অস্তিত্ব থাকা পর্য্যন্ত নয় । শুকদেব জনকের কাছে ব্রহ্মবিদ্যালাভের জন্য গিয়েছিলেন । গিয়ে দেখে কি জনক কয়েকটি উলঙ্গ সুন্দরী যুবতী মেয়ে কোলে করে বসে । দেখেই তাঁর ঘৃণা হ’ল । এর কাছে উপদেশ নিব ? তৎক্ষণাৎ ফিরে চললেন, ভক্তি বিশ্বাস তাঁর সেখানেই চট্‌কে গেল । জনক টের পেয়ে তৈলপুর্ণ একটি বাটি দিয়ে বললেন, তুমি আমার রাজপুরীটা দর্শন করে এসো, দেখো তৈল যেন এক ফোঁটা মাটিতে না পড়ে; তা হ’লে তোমার শিরচ্ছেদন হবে । এই প্রহরী তরবারী হস্তে তোমার পিছনে রইলো । শুকদেব আর পুরী দেখবেন কি ? তাঁর মন তো বাটীর উপর । তেমনি আমার মন গুরুমুখী হয়ে আছে । আমার কাছে স্ত্রীই বা কি,আর পুরুষই বা কি; উলঙ্গই বা কি, কাপড় পরাই বা কি ? বাবা তরণী, তবেই দেখ, সবই মনে । মন পাখীকে এবার “জয় গুরু” বলে ধ্বংস করে ফেল ।”

শিষ্যঃ- আপনি আমাদের ভুলে থাকলে আমাদের দুর্গতি দূর হবে কি করে ? সংসারের ঘূর্ণীপাকে নাজেহাল হয়ে পড়ছি ।

উত্তরঃ- ভক্তের কাঙ্গাল কি ভক্তকে ভুলতে পারে ? যার জন্য আমাকে এই হাড় মাংসের দেহ ধারণ করতে হলো । গুরুতে মন রেখে বিদ্যার সংসার করতে হবে । আর অবিদ্যার সংসার রিপু নিয়ে সংসার । বিদ্যার সংসারে নাম নাই । গুরুতে বিশ্বাস রাখ, মনপ্রাণ সমর্পণ কর, সব হবে । আমি বিশ্বাস রেখেছি, মনপ্রাণ সমর্পণ করেছি, তাই অমর-লোকে বাস করছি । তুমিও আমার মত হও ।”

স্বামী ব্রজানন্দ
শ্রীশ্রী বুড়াশিবধাম
রমনা, ঢাকা, ১৩/৬/৬৬

২৭. “গ্রন্থ-প্রতিপাদ্য প্রকৃত বিদ্যালাভ হতে অনেক দূরে । গ্রন্থ-প্রতিপাদ্য বিষ্য-বিদ্যালাভ । যে বিদ্যাতে আত্মবিকাশ, আত্মজ্ঞান লাভ হয় না – সে বিদ্যা বিদ্যাই নয় ।”
২৮. “মানুষের ধৈর্য্য চাই । ধৈর্য্য না থাকলে মানুষই না । ধৈর্য্য ধরে থাক – আমি আছি পাছে পাছে ।”
২৯. মন্ত্রের তিনটি অংশ – প্রণব, ওঁকার, বীজ । বীজমন্ত্র সোহহং-শিব-বিষ্ণু-কৃষ্ণ যার যে উপাস্য । প্রণব জপ করিলে আত্মজ্ঞান লাভ হয় । যত প্রকার বাক্য আছে সে সমস্ত বাক্যের পরিসমাপ্তি একমাত্র প্রণবে । প্রণবের পরে আর বচন নাই । সর্বদা প্রণব উচ্চারণ করিতে পারিলে চারি বেদের পাঠ হইয়া যায় ? প্রণব একাক্ষর ছন্দ স্ত্রী-পুরুষ সকলেই এই বাক্য উচ্চারণ করিবার অধিকারী । ইহার সূক্ষ্মভাব এই যে আত্মাই সত্য আত্মভিন্ন প্রণবাদি মিথ্যা মায়া মাত্র । আমি আত্মা – জীব নই – দেহ নই – মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়াদি নই । এইরূপ নিশ্চয় রাখিয়া প্রণব উচ্চারণ চিন্তা করিবে ।
৩০. আমার প্রকাশেই সকলের প্রকাশ । সেই আত্মার স্বরূপ তুমি । তোমার প্রকাশ দিয়াই সকল প্রকাশ । তুমি স্বপ্রকাশ । তোমার প্রকাশেই সকলের প্রকাশ । তোমাকে কেহই প্রকাশ করিতে পারে না । তুমি চৈতন্য নির্বিকার পুরুষ । যেমন নট নানা প্রকার নাটক করিয়াও সে নটত্ত্ব নিশ্চয় হারায় না । সেইরূপ তুমি প্রাণবাদি চিন্তন, মনন, ধ্যান করিয়াও নিজ স্বরূপ হইতে বিচলিত হইলে তবেই তুমি সংসার সাগর হইতে মুক্ত হইয়া যাইবে । এবং দুঃখ কষ্টের হাত এড়াইবে । তুমিত মুক্তি – তোমাকে আবার মুক্ত করে কে ? মন্ত্রের ইহাই হইল সূক্ষ্ম ভাব ।
৩১. গুরুপথে গুরুরূপ ধ্যান চিন্তা মনন দ্বারা নিজ স্বরূপের প্রকাশ হয় । গুরুদেব নাম দিয়া চিত্ত দর্পণের ময়লা দূর করিয়া যান । তখন নিজ স্বরূপ আপনি প্রকাশ হইয়া পড়ে । যেমন সূর্য্য নারায়ণকে মেঘে আবরণ করে, মেঘ সরিয়া গেলেই সূর্য্য আপনি প্রকাশ হয় ।
৩২. নাম আর বিন্দুভেদে সৃষ্টি দুই প্রকার । এক “বাহা সৃষ্টি” পিতামাতা কর্তৃক । আর এক সৃষ্টি গুরু কর্তৃক “নাম সৃষ্টি” ।গুরু কাণে নাম দিয়া শির্ষ্যের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করিয়া জ্ঞান ভক্তি দিয়া উদ্ধার করেন । গুরু সোহহং বীজ কাণে দিয়া পূর্বদেহ নাশ করে – তুমি দেহ নও আত্মা – এই পঞ্চ ভূতাত্মক তাগৎ জর দুঃখজরা দেহ তুমি নও – তুমি সৎ চিৎ আনন্দরূপ আত্মা এই নিশ্চয় জন্মাইয়া দেন ।
৩৩. সোহহং বীজ দানে শিষ্যের অলৌকিক জন্মলাভ হয় । সেই হেতু সোহংকে বীজমন্ত্র বলে । সোহহং মন্ত্রের সূক্ষ্মভাব এই – ব্রজানন্দরূপ শিব, বিষ্ণু বা কৃষ্ণ দেবতা আপন স্বরূপ বোধ করা চাই । অর্থাৎ আমি চৈতন্য স্বরূপ আত্মা সমস্ত জগতের নিয়ন্তা ও নির্বাহ কর্ত্তা । এই বোধে ধ্যান চিন্তা পূজাই সূক্ষ্মভাবের সাধনা । গুরুকে আকার বোধে পূজা ধ্যানই নিত্য ফলদায়ক নতুবা অনিত্য ফললাভ হয় ।
৩৪. বাৎসল্য ভাব নিয়ে যে আমায় লালন পালন করে – কৃপা পরবশ হইয়া আমি তাকে ধরা দেই । দাপরে যশোদা মাঈ এর যেমন কৃষ্ণ দর্শন হইয়াছিল । যে যেভাবে আমায় ভজনা করে – আমি সেই ভাবেই তার সাথে একাত্ম হইয়া যাই । যার যেমন ভাব তার তেমন লাভ ।
৩৫. সভক্তি সাধন ভজনে মায়াজাল ছিন্ন হয় – পাপ অবিদ্যা দূর হয় – ভগবৎ পদে নিষ্ঠালাভ হয় – নিষ্ঠা হইতে নামে রুচি হয় – রুচি হইতে আসক্তি জন্মে – আসক্তি হইতে ভাবের উদয় হয় । ভাব হইতে প্রেমলাভ হয় । এইখানেই সাধনার সমাপ্তি – ঈশ্বরত্বলাভ ।
৩৬. ‘ভগবান মঙ্গলময় শান্তিদাতা, এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে অমঙ্গল দূর হয় – অশান্তি থাকে না । দৃঢ়বিশ্বাস আন ।
৩৭. আত্মজয়ী হইয়া জন্ম মৃত্যুর হাত হইতে মুক্ত হও । তোমার জন্ম সফল কর । শ্রীভগবানের চরণ সেবায় তোমার জীবন অতিবাহিত কর । সংসার সাগরে ডুবন্ত মন ভাসিয়া নির্লিপ্ত হইয়া উঠুক । সাধু গুরুর সেবা পরিচর্য্যায় দেহ প্রাণ ঢালিয়া দাও । তবেই এই নশ্বর দেহের সার্থকতা । নতুবা এই হাড় মাংসময় দেহের মূল্য কি ?
৩৮. ভক্তের টান শক্ত টান । সে টান কি আমি এড়াইতে পারি ? ভক্ত আমার বড় প্রিয় । ভক্ত আমার প্রাণের প্রাণ । ভক্তের কারণে আসি এ ভুবনে ভক্তজনে করি পরিত্রাণ । ভক্তের জন্যই আমার এই আবির্ভাব ।
৩৯. বৈষ্ণবের পদধূলি পড়ে যার গৃহে সপ্তকোটি কুল তার হইবে উদ্ধার । বৈষ্ণবকে আপজন বলি যদি কাহারও প্রাণে সাড়া দেয় তাহাকে আমার আপন করিয়া লই তাহার সপ্তকোটি কুল উদ্ধার করি ।

সংঘ শক্তি
শ্রী নিবারণ চন্দ্র সাহা
৪০. কলিযুগে সংঘশক্তি অতিপ্রবল । সাধনের এক লক্ষ্যে পৌঁছিতে হইলে সর্বাবস্থায় সংঘবদ্ধ অবস্থায় কাজ করিলে তাহা সহজে সম্পাদন হয় । একের চেষ্টায় বা উদ্যোগে তাহা কখনও সম্ভব হয় না । সকলের প্রাণে আগ্রহ ও ব্যাকুলতা সমভাবে জাগ্রত হইলে সংঘ প্রতিষ্ঠা লাভ করে । সংঘ শক্তি ব্যতীত জগতে কিছুই গঠিত হইতে পারে না । সংঘের শক্তি অপরিসীম । সেই জন্য আমাদের পরমারাধ্য শ্রীগুরুদেব স্বামী ব্রজানন্দ পরমহংস মহাপ্রভু জীউ ধর্ম ও আত্মিক উন্নতি, বিশ্বকল্যাণে – বিশ্বলোক হিতার্থে, বিশ্বজাগরণে সংঘ শক্তির বিশেষ প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন । সেইজন্য তিনি তাঁহার পদাশ্রিত ও শরণাগত সন্তান সন্ততিগণকে উপদেশ প্রদান করিয়া সংঘের শক্তি ও তাহার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে বলেন –
তোমাদের জীবনের লক্ষ্য এক । তোমরা সর্বদা মনে রাখিও সমস্ত গুরু ভ্রাতা-ভগ্নিকে এক পরিবার ভুক্ত, সকলে একই পিতার সন্তান, এই অনুভূতি তোমাদের প্রাণে উদয় হইলে তোমাদের যাবতীয় হিংসা দ্বেষ, ক্ষুদ্র অশান্তি বিদুরিত হইবে ।

বিশ্ববাসী জাতি ধর্ম নির্বিশেষে যখন “তত্ত্বমসি” মহাকাব্যের সুমহান নীতি গ্রহণ করিবে তখন জগতে সচ্চিদানন্দের পূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠিত হইবে, মনের কপটতা, হিংসা দ্বেষ পলায়ন করিবে, বিশ্ব আনন্দের-মঙ্গল জয় শংখ পুনরায় বাজিয়ে উঠিবে, নিখিল বিশ্বে শাশ্বত অনাবিল শান্তি প্রতিষ্ঠা লাভ করিবে । প্রাণে প্রকৃত মধুর ভাব উদিত হইলে কিছুই অসাধ্য থাকে না ।

তোমরা গুরুধামের বিশেষ বিশেষ উৎসবে এবং সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিবসে একত্রিত হইয়া আসনে প্রণাম, পূজার্চ্চনা, আরতি, ভজন কীর্তন করিবে । সদ্‌গুরু ভগবানের মহাভাব ও মহাপ্রেমের বিষয় চিন্তা, ধর্মালোচনা, সাধন মার্গে ও আধ্যাত্মিক পথে উন্নতিবিধান, নিঃস্বার্থ সেবাধর্ম উদযাপন করাই এই গুরুধাম মহামিলন মঠের প্রধান উদ্দেশ্য তাহা বিশেষভাবে পর্যালোচনা ক্রমে কর্ম পন্থা নির্দ্ধারণ করিবে, গুরুধামের সুশৃঙ্খলা, রক্ষণাবেক্ষণের সুষ্ঠ উপায় উদ্ভাবন করিবে ।

এই গুরুধাম প্রতিষ্ঠার মূলে কি সত্য, আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিহিত আছে তাহা বিশেষ ভাবে পরিস্ফুট করিয়া বিশ্ব কল্যাণে ও লোকহিত কর্মে বিশ্ববাসীর সম্মুখে উত্থাপিত করিয়া আদর্শ নিষ্কাম সেবা ধর্ম্মের কথা ধরিয়া তুলিও । সংঘে একত্রিত হইয়া ভাব বিনিময় ও আলোচনা করিও । আমি স্থুল দেহে ধামে উপস্থিত থাকিলে তোমরা যেরূপ – সংযম, শ্রদ্ধা ভক্তির সহিত উপবেশন কর সংঘে উপস্থিত হইয়াও তোমরা শ্রদ্ধা ভক্তির সহিত উপবেশন করিবে ।
সর্বদা আসনে আমি প্রত্যক্ষ আছি এবং তোমাদের কার্যকলাপ সমস্তই লক্ষ্য করিতেছি । আমি ও আমার আসন এক । এই সিদ্ধ আসনই গুরুশক্তি । তাহা কদাচ কেহ গ্রহণ বা ব্যবহার করিবে না ।

তোমরা ভক্তি নিষ্ঠার সহিত গুরুপীঠ বা গুরুর আসনের সর্বোতভাবে সর্বদা পবিত্রতা রক্ষা করিবে । আমার আসন কথা বলিবে । যাহার যাহা অভিলাষ আসনে জানাইবে । আমি কোথায় নাই ? গুরু কোথায় নাই ? তিনি আছেন আকাশে-বাতাসে প্রতি জীবের অন্তরে । তিনি ভক্তি লভ্য, ভাবগম্য । আসনেই তাঁহাকে খুঁজিয়া পাইবে । কাজেই গুরুর আসনের পবিত্রতা রক্ষা করা প্রত্যেক ভক্ত শিষ্যের কর্তব্য । গুরুধাম কৈলাস ধাম স্বরুপ, গুরুগৃহ চিন্তামণি স্বরূপ, গুরু গৃহস্থিত তরু সমূহ কল্পবৃক্ষ স্বরূপ, জলাশয় অমৃত শাখার স্বরূপ, পুষ্প সকল মণি স্বরূপ । সুবুদ্ধি ব্যক্তির কর্তব্য গুরুস্থান দর্শন মাত্র সিদ্ধজ্ঞান করিয়া দণ্ডব্য নমস্কার করা । গুরুর সিদ্ধ আসন এবং গুরু অভিন্ন । আসনে সরল প্রাণে ভক্তি বিশ্বাসে যে যাহা প্রার্থনা করিবে আমি তাহা পূর্ণ করিয়া থাকি ।

সংঘে যখন গুরু ভাই-বোনগণ সমবেত হইবে তখন পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় করিও । এইরূপ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সাধন মার্গের দোষ ক্রটি ধরা পড়িবে এবং অন্যের সাহায্যে সাধনমার্গে পথ সুগম হইবে । সদ্ভক্তের সঙ্গলাভ এবং নিঃস্বার্থ নিষ্কাম কর্ম উদযাপন করিয়া সাধনপথে অগ্রসর হইবে । তাহাতে মনের মলিনতা, আবিলতা দূর হইবে । প্রাণে বিমল আনন্দ উপভোগ করিবে । চিত্তশুদ্ধিই একমাত্র ভগবানকে লাভ করিবার প্রকৃষ্ঠ পন্থা । কাজেই নিষ্কপটে সুষ্ঠভাবে সংঘ পরিচালনা করিতে পারিলে তোমরা অচিরে শ্রীগুরু ভগবানের কৃপা লাভে সমর্থ হইতে পারিবে । এই জগতে এমন কোন শক্তি নাই তোমাদের অনিষ্ঠ সাধন করিতে পারে । তোমরা সংঘকে দৃঢ়ভাবে ধরিয়া রাখিতে পারিলে – সমগ্র বিশ্ব একত্রিত হইয়াও তোমাদিগকে বিব্রত ও বিপন্ন করিতে পারিবে না । গুরু ও সংঘের সহিত তোমরা ঠিক ঠিক সম্বন্ধ রাখ । সাধু সঙ্কল্পে অবিচলিত থাক । সেই শিষ্য গুরুশক্তি দ্বারা সর্বোতভাবে সুরক্ষিত । চতুর্দ্দশ ভুবনে এমন কোন শক্তি নাই তাহার কেশাগ্র স্পর্শ করিতে পারে ।

এক লক্ষ্য বা ইষ্ট সিদ্ধিলাভের জন্য সকলের প্রাণে আকুলতা জন্মিলে সংঘের সৃষ্টি হয় । এই সংঘ অতুলনীয় । তোমাদের অনৈক্য, মতবৈষম্য, ক্ষুদ্র অশান্তি সমস্ত ভুলিয়া গিয়া প্রাণের নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিলে তোমরা জগতে অসাধ্য সাধন করিতে পারিবে, মায়াবদ্ধ সংসারে থাকিয়াও অমৃতরস আস্বাদন করিতে পারিবে ।
শ্রীভগবান গীতায় বলিয়াছেনঃ-
যজ্ঞে দান তপঃ কর্ম ন ত্যাজ্যং কার্য্যমেবত্য ।
যজ্ঞেদানং তপশ্চৈব পাবনাণি মণীষিনাম্‌ ।।
গীতা-১৮/৫ শ্লোক

যজ্ঞ, দান, তপস্যা, কর্ম ত্যাজ্য নহে । এই সকল কর্মফল বিদ্বানগণের চিত্তশুদ্ধিকর । সত্য যুগে তপস্যা, দ্বাপরে যজ্ঞ এবং কলিতে একমাত্র দানই শ্রেষ্ঠ ধর্ম । গৃহীদের ধনসম্পত্তি উপার্জনে বহুবিধ পাপ সঞ্চয় হয় । দান ধর্ম দ্বারা এই সকল পাপের প্রতিকার ও পরিশোধন হইতে পারে । গৃহীদের সাংসারিক উপার্জনের কিয়দংশ ব্যয় করিতে হয় ।

সকল ধর্মেই দানের কথা বলা হইয়াছে । নচেৎ বিত্তশাঠ্য-দোষ ঘটে । অত্যধিক মণি কাঞ্চনের আসক্তি মানুষকে ঘৃণিত পশু পর্য্যায়ে অবতরণ করায় । অত্যাধিক মণি কাঞ্চনের আসক্তি ধর্মপথের প্রধান অন্তরায় । আবার অত্যাধিক দান করিয়াও ভিখারী হইতে শাস্ত্র কাহাকেও উপদেশ প্রদান করে নাই । পরিমিত ব্যয় এবং অর্থের সদ্ব্যবহারের উপদেশ শাস্ত্রে প্রদত্ত হইয়াছে । অর্থ সদ্ভাবে ব্যায়িত হইলে মনেও সত্যিকারের আনন্দ লাভ হয় ।

অনেক ক্ষেত্রে অতুল ঐশ্বর্য্যের অধিকারী হিন্দু দান-ধর্মে সম্পূর্ণ বিতশ্রদ্ধ । গুরু দেবদ্বিজে, মঠ মন্দিরে তাহাদের শ্রদ্ধা ভক্তি বিশ্বাস একটুকুও নাই । অথচ নিজেদের অপরিমিত খরচের জন্য পরোপকার ব্যয়ে তাহাদের কুন্ঠাবোধ হয় । শাস্ত্রে আছে যে নিজ প্রয়োজন ভিন্ন অতিরিক্ত সঞ্চয় রাখে বা নিয়ে আত্মসাৎ করে সে চোর । অপর দিকে দৃষ্টিপাত করিলে দেখা যায় কুটীর নিবাসী অর্থ সামর্থহীন মুসলমান এক পয়সা, দুই পয়সা ভিক্ষা করিয়া খোদার পাকা মন্দির (মস্‌জিদ) নির্মাণ করেন । এইরূপ ভগদ্ভক্তি, ধর্মানুষ্ঠানে মহৎ প্রেরণা বাস্তবিক প্রসংশনীয় এবং অনুকরণ যোগ্য । অর্থ ভিন্ন সংসার জীবন নির্বাহ হইতে পারে না । সংসারী জীবের অর্থের প্রয়োজন আছে । কিন্তু নিজসুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য অযথা অপরিমিত ব্যয় শাস্ত্রবিরুদ্ধ । ধর্মজ্ঞ সৎকর্মে গৃহীর আয়ের কিয়দংশ ব্যয়িত হওয়া শাস্ত্রানুমোদিত । সুতরাং যথার্থ অর্থ সদ্ব্যবহারের জন্য মুষ্টি ভিক্ষা সংরক্ষণ, মঠাশ্রমের জন্য মাসিক চাঁদা মঠাশ্রমের ধর্ম বিষয়ে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে প্রকাশিত পত্রিকা গ্রহণ, মঠাশ্রমে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠিত উৎসবে যথাশক্তি সাহায্য দান এবং নিয়মিত ভাবে যোগদান করা প্রয়োজন । শাস্ত্রমতে মঠাশ্রমের জন্য সর্বাগ্রে মুষ্টি ভিক্ষা রাখিয়া সেই সকল গৃহী অন্নভোজন করেন তাঁহারা যজ্ঞবিশেষের অমৃত ভোজনের ফল লাভ করিয়াছেন । বৌদ্ধগণ সর্বদা তাঁহাদের খাদ্যের অগ্রভাগ বৌদ্ধ ভিক্ষুককে দান করিয়া পরে তাঁহারা নিজে ভোজন করেন । যে গৃহী গুরু ভগবানকে অন্নদান না করিয়া এবং সৎকর্মে দান না করিয়া নিজের উদর পরিপূর্ণ করে শাস্ত্রের বিচারে তাহারা রাক্ষস । ধর্ম্ম সেখানে প্রবেশের পথ পায় না । মঠাশ্রমের ত্যাগী সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীগণ গুরু ভাই ভগ্নীগণের বাড়ীতে বাড়ীতে এবং বিভিন্নস্থান ঘুরিয়া ফিরিয়া সেই সকল মুষ্টি ভিক্ষা উপকরণ ও অর্থ সংগ্রহ করে তাহাও তোমাদের গুরু সেবায় ব্যয়িত হয় । মুষ্টি ভিক্ষা এবং আর্থিক সাহায্যে ধামবাসী তোমাদের ত্যাগী সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারীভাইগণ এবং অতিথিগণ প্রসাদ ভক্ষণে প্রতিপালিত এবং সেবিত হইতেছে । তোমাদের এইরূপ ক্ষুদ্রদানেও এইরূপ মহৎকার্য সম্পাদিত হইতেছে । ইহা সহজ কথা নহে । গৃহীদের পক্ষে মুষ্টিভিক্ষা সংরক্ষণ সহজসাধ্য ত্যাগ অথচ এই মুষ্টি ভিক্ষায় মহৎ কার্য্য অনুষ্ঠিত হইতেছে । গৃহীগণ অনায়াসে সাধ্যানুসারে ক্রমশঃ,ত্যাগধর্মে অগ্রসর হইতে পারে ।

আমি চাই তোমরা আদর্শ গৃহী হও । তোমরা মনে প্রাণে দৃঢ় হও । গরিষ্ঠ হও, সত্যাশ্রয় হও । সংসারে তোমাদের দ্বারা – পুত্র-পরিজন বিষয়-সম্পত্তি যশখ্যাতি সমস্তই থাকিবে । তোমরা অনাসক্ত ভাবে নিষ্কাম কর্ম করিয়া যাইবে । ভগবানের উদ্দেশ্যে কোন ফলাকাঙ্ক্ষা না করিয়া কার্য্য করার নামই নিষ্কাম নিঃস্বার্থ কর্ম । এই কর্মে তোমাদের বন্ধন নাই । তোমরা ভগবানের সংসারে নিযুক্ত কর্মচারী । তাঁহার রচিত বিশ্বশালায় কর্ম করিয়া যাও । জ্ঞানী সংসার করে অনাসক্তভাবে আর অজ্ঞানী সংসার করে বিষয়-বিষে-আসক্ত হইয়া । তাহাতেই কর্ম্ম বন্ধন ঘটে ।

বাসনাই বারংবার জন্মিবার কারণ । এই সংসারে যাহার যতটুকু পাওনা ততটুকু তাহাকে কড়ায় গন্ডায় পরিশোধ করিয়া দিতে হইবে । অথচ নিজ লক্ষ্যে সর্বদা সজাগ ও ধীর স্থির থাকিতে হইবে । প্রত্যেকের সমান অধিকার আছে । কাহাকেও দাবাইয়া কাহারও অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যায় না । যেইখানে ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় সেইখানে প্রেম আসিতে পারে না এবং মনুষ্যপ্রীতি, প্রেম-ভালবাসা বিশ্বমানবতা বিশ্বধর্মের বিলুপ্তি ঘটে । অনাসক্ত আদর্শগৃহী সংসারে হাসিয়া খেলিয়া ভগবানের কার্য্য করিয়া যাইতেছে । মুক্তি তাহাদের করতলগত । আর বিষয় মদিরায় মত্ত হইয়া অজ্ঞান-সংসারী সংসার মরু ভূখন্ডে তৃষিত হরিণের মত ধাবিত হইতেছে । তাঁহাদের মুক্তি কোথায় ? যেই তিমিরে সেই তিমিরেই পড়িয়া থাকিবে ।

অগ্রে তোমরা নিজে আদর্শ হও । তোমাদের নিজ পরিবারস্থ-পরিজনকে আদর্শে গড়িয়া তোল । তোমাদের আদর্শ অবলোকন করিয়া গ্রামবাসী মহৎ আদর্শে অনুপ্রাণিত হইবে । এইভাবে দেশ-বিদেশে আদর্শের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি ফুটিয়া উঠিবে । তোমাদের আত্মত্যাগে ও নিষ্কাম মহৎকার্য্যে অনুপ্রাণিত হইয়া শত শত সহস্র সহস্র ব্যক্তি ত্যাগের মহামন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া দেশ-দেশান্তরে বিজয় অভিযানে বাহির হইবে । আদর্শকে রূপদান করাই তোমাদের কর্ম ও সাধনা । তোমরা বিশ্বজাগরণে ত্যাগের নিঃস্বার্থ মহান কর্মে এগিয়ে চল । মাভৈঃ তোমাদের সকল ভার, সকল বোঝা আমি বহন করিব ।

গুরুর উপর নির্ভর করিয়া তাঁহার নিকট শক্তি সামর্থ প্রার্থনা কর । তিনি তোমাদিগকে শক্তি সামর্থ, প্রেরণা যোগাইবেন । আমার ভক্তের ধ্বংস নাই । আমার ভক্ত যেইখানে যায় আমি তাহার পশ্চাতে গমন করি । আমার ভক্তের পশ্চাতে মুক্তি স্তুতি করিয়া যায় ।

জগতে কর্ম্মেরই প্রশস্তি । কেহ কৈফিয়ত শুনিতে চায় না । তোমরা আদর্শ নিষ্কাম কর্ম করিয়া যাও বিশ্ববাসী তোমাদের সুমহান কর্মের জন্য জয়ের মালা পরাইয়া দিবে।তোমাদের নিঃস্বার্থ কর্মে অনুপ্রাণিত হইয়া তাহারা নব নব কর্মের প্রেরণা লাভ করিবে।তোমরা জ্ঞানে যখন সমদর্শী হইবে,প্রেমে প্রীতিমান হইবে এবং কর্ম্মে সর্বভূত কল্যাণে ব্রতী হইবে তখন এই বিশ্বশান্তির অমিয় হিল্লোল বহিতে থাকিবে।

গৃহীর সাহায্য ভিন্ন কোন আশ্রমই পরিপুষ্টি লাভ করিতে পারে না।গৃহী ও সন্ন্যাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জগতে মহৎকার্য্য প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারে।

তোমরা তোমাদের ত্যাগী সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারী ভাইগণকে তাহাদের কার্য্যে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কর।তোমাদের সাহায্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় তাহারা শক্তি ও মহৎ কার্য্যের নব নব প্রেরণা লাভ করিবে।তাহাতে জগতের অনেক কল্যাণ সাধিত হইবে।“জগদ্বিতায় বহুজনহিতায়চ” যে কর্ম তাহা সম্পাদন করাই পৌরুষত্ব এবং সুদুর্লভ মানবজীবনের পূর্ণতা ও সার্থকতা । একই লক্ষ্য ও আদর্শের ভিতর দিয়া যে ঐক্য ও মিলন স্থাপিত হয় তাহাই স্থায়ী মিলন, প্রকৃত সম্বন্ধ । নিঃস্বার্থ প্রেমপ্রীতি ভালবাসাই মানুষের হৃদয় জয় করিতে পারে । সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রাণে উদিত হইলে কর্মেরপ্রাণে সাড়া ও প্রেরনা জাগ্রত হয় । নিজেরাও গুরু ভাই ভগ্নিদের মধ্যে সাধনার পবিত্র শিক্ষা প্রদান কর । মহান লক্ষ্য ও আদর্শের বেদীমূলে প্রত্যেকে অভিমান, অহংকার, কর্ত্তৃত্ত্ব, প্রভুত্ব ছাড়িয়া নিঃস্বার্থ সেবার ভার লইয়া সুমহান কর্তব্যপথে অগ্রসর হও । প্রতি কর্মে, প্রতি পদক্ষেপে ভগবৎ শক্তি প্রার্থনা কর । তবেই তোমাদের লক্ষ্য সিদ্ধ হইবে । তোমাদের মধুর পবিত্র জীবন হইতে প্রকৃত প্রেরণা লাভ করিবে । তোমাদের অদম্য শক্তি ও সৎ সাহসে সত্যিকার সাহস ও শক্তি লাভ করিয়া সমস্ত বিপদাপদ উপেক্ষা করিয়া সকলে লক্ষ্যে উপনীত হইবে । সহস্র সহস্র লোক তোমাদের নিঃস্বার্থ সেবার কর্তব্য ও দ্বায়িত্ববোধ অবলোকন করিয়া সাগ্রহে তোমাদের সঙ্গে মিলিত হইয়া তোমাদের কর্মে অংশগ্রহণ করিবে । নিঃস্বার্থ প্রেমপ্রীতি ভালবাসাই মানুষের মনে প্রাণে সত্যিকারের আনন্দ জাগায়, মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে ।

সহকর্মিগণের নিকট হইতে যদি বাস্তবিক আন্তরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা পাইতে চাও তবে তোমার গুরুদায়িত্ব, দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের কিছু অংশ সহকর্মিগণকে বিলাইয়া দাও । তাহারা অংশগ্রহণ করুক । তবেই তাহারা তোমার সহিত সমতা রক্ষা করিয়া সমান দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়া কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে পারিবে । তুমি যেই কর্মে অগ্রসর হইবে তাহারাও সানন্দে প্রয়োজনবোধে বিনা দ্বিধায়, বিনা আহ্বানে জীবনপণ করিয়া বীর সৈনিকের মত জীবনপণ করিয়া তোমার অনুসরণ করিবে ।

৪১. শ্রীগুরুতে ভক্তি স্থাপন কর – ইহা অতি মঙ্গলের কাজ । ভক্তকে বেষ্টন করিয়াই শ্রীগুরুর দৃষ্টি নিবদ্ধ ।
৪২. সত্তগুণী লোকে যাহা বলে – তাহা মিথ্যা হয় না । গুরুবাক্য অবশ্যম্ভাবী ।
৪৩. ভক্তির প্রভাবে ভক্তের সাফল্য অনিবার্য – ভক্ত সর্বজয়ী ।
৪৪. বুড়াশিবের শিবরাত্রি দর্শনের ফলে পূণ্য সঞ্চয় হয় – দিব্যদৃষ্টি গোচর হয়, দিব্যজ্ঞান লাভ হয় । দিব্যজ্ঞান লাভ না হইলে অনুভূতি হয় না ।
৪৫. শাস্ত্র পুরাণের কথা – সাধুর মঙ্গলময় দৃষ্টি যে দিকে পড়ে – সে দিকের অমঙ্গল দূর হ’য়ে যায় ।
৪৬. নাম তরোয়াল হাতে নিয়ে বসে থাক – কোন ভয় থাকবে না । শিবোহহম্‌ শিবোহহম্‌ মহামন্ত্র উচ্চারণ কর – দ্বাদশ সিংহের বল সঞ্চার হইবে – জন্ম মৃত্যু রহিত হইবে ।
৪৭. সাধু যাহা বলেন তাহাই হয় । সাধুবাক্য কদাচ মিথ্যা হয় না ।
৪৮. প্রতিনিয়ত জপের জন্য শ্বাসে শ্বাসে শিবোহহম্‌ এই মহামন্ত্রই ব্যবস্থা । এতে মনের বিক্ষিপ্ত অবস্থা সহজে দূর হয় । সব সময়ই উঠিতে বসিতে শ্বাসের উঠা নামার সঙ্গে সঙ্গেই জপ চলিতে থাকে ।
৪৯. ধ্যান গুরুমূর্তিতে অভেদ ভাবে করতে হ’বে । ধ্যান একবার জমে গেলে – আর মনস্থির হ’লেই সব ঠিক হ’য়ে গেল । তখন আর এই মায়ার দুনিয়া থাকে না ।
৫০. আমি কৃপা-পরবশ হয়ে জীবের চক্ষু স্পর্শ করে চক্ষুদান করি – কন্ঠ স্পর্শ করে তাহা ভেদ করি । ফলে জ্ঞানের বিকাশ হয় – আমায় চিনতে পারে । আমায় ধরতে বুঝতে ইন্দ্রিয় নিগ্রহ করতে হয়না কেবল মদর্থে কর্ম করে গেলেই – (মৎদর্শন-মৎকথাশ্রবণ-মৎকীর্তন) —মন আপনিই সংযত হয় । স্বল্পায়ু কলির জীবের জন্য এই সরল পথ – জীবের সর্বভার বিমোচনের জন্য এসেছি । ভক্তি-বিশ্বাস করে মৎদর্শন বুদ্ধিতে এই সুগম পথে অগ্রসর হও – বিষয়বুদ্ধি দূর হয়ে পরমকল্যাণলাভ হবে – কর্মফলে পাবে না । পদ্ম-পত্রস্থ জলের ন্যায় পাপ পরিশূণ্য দেহে বিচরণ করবে ।
৫১. শিবোহহম্‌ শব্দের অর্থ – জ্ঞান । আমি সেই ব্রজানন্দরূপ শিব, এই ভাবে জপ ধ্যান না করে এক কথায় – “শিবোহহম্‌” জপ করা । অর্থ একই, কোন বিভিন্ন না । শিবঃ+অহম্‌ = শিবোহহম্‌ সন্ধি শব্দ । শিব অর্থ পরব্রহ্ম-পরমাত্না গুরু, আর অহম্‌ অর্থ আমি ।

এই আমি দুই প্রকার – বিদ্যা আমি আর অবিদ্যা আমি । বদ্ধজীবে নিজেকে অবিদ্যা আমি মনে করি । আর মুক্তজীবে নিজেকে বিদ্যা আমি মনে করে । নিজেকে বিদ্যা আমি মনে কর । এই বিদ্যা আমিই আত্মপর – নিজ আত্মাকে লক্ষ্য কর । দেহ ইন্দ্রিয়াদি মন বুদ্ধিতে লক্ষ্য করে না । ‘অবিদ্যা আমি’ দেহ ইন্দ্রিয়াদি মন বুদ্ধিকে লক্ষ্য করে । তাই বদ্ধজীব পুনঃ পুনঃ জন্ম-মৃত্যুরূপ-সংসার দুঃখ ভোগ করে । আর মুক্তজীব ইহার কিছুই ভোগ করে না । দেহে থাকিয়াও দেহে নাই – নির্লিপ্ত । তোমার ‘আমিকে” গুরুরূপী – ‘শিবাত্মাকে’ নিজ আত্মা আমি ধর । এই অভেদ উপাসনা । এইভাবে অভেদ উপাসনা করে – ‘রূপজাল ছিন্ন করে – মায়ার গন্ডি ভেঙ্গে সিংহের মত বাহির হ’য়ে পড় । জ্ঞান-ভক্তি না হ’লে –বিবেক বৈরাগ্য না হলে – ত্যাগী না হলে হয় না । মাছির মত একবার মধুর ভাণ্ডে – আর একবার বিষ্ঠার ভাণ্ডে বসে লাভ নাই । ভোগীর মত জপ তপও করি আবার সংসারও করি ।
৫২. যজ্ঞাহুতি করিবার সময় প্রথমে আচমন অঙ্গন্যাস করিয়া নিজের অভীষ্পিত বর প্রার্থনা করিবে, মনে মনে করজোর করিয়া । যেমন হে অন্তর্য্যামী ন জ্যোতিস্বরূপ আপনি অমৃতস্বরূপ, মঙ্গলময় ও শান্তিময় । আমরা বিষয়ভোগে আসক্ত হইয়া আপনাকে ভুলিয়া থাকি । কিন্তু আপনি নিজগুণে আমাদিগকে ভুলিবেন না । আমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করিয়া শান্তিবিধানপূর্বক পরমানন্দে রাখুন । স্থুল শরীরে বা মনে কোন প্রকার দুঃখ কষ্ট না হউক । হে মঙ্গলময়, মঙ্গল করুন । আপনাকে পূর্ণরূপে বারংবার প্রণাম করি । এইভাব সরল ও নিজ ভাষায় প্রার্থনা করিবে । তারপর শৈবাগ্নি মঙ্গলকারী অগ্নি এই নামকরণ করিয়া পূর্বাপর লিখিত মন্ত্রে তিনটি বা পাঁচটি আহুতি দিয়া নির্বাণ করিবে । শান্তিঃর্ভব শান্তিঃর্ভব শান্তিঃর্ভব বলিয়া জল ছিটাইয়া দিবে, ইহাতে কোন ভয় বা সংশয় নাই । সব রকমে মঙ্গলই আছে ।
৫৩. ব্রজানন্দের চরণে যে মাথা নোয়াইয়াছে – তাহার মাথায় আঘাত দিবার এ – সংসারে কেহ জন্মে নাই । সে মাথায় আঘাত দিয়াছে, কি নিজের মাথায় আঘাত খাইয়াছে ।
৫৪. ভক্ত আমার প্রাণ । ভক্ত কভু আমার চরণ ছাড়া হয় না । আর আমিও তাদের ছাড়া হই না । গুরুধাম তোমাদের হিতকল্পে আবির্ভূত – ভক্ত ভগবানের মিলন-মন্দির ।
৫৫. দেশে শান্তি নাই । উল্টা বিচার করলি রাম । কোথায় স্বাধীনতা ? এ যে পরাধীনতার একশেষ । মালিককে ভুলিয়া গিয়াছে – তাই লোকের এত দুর্গতি ।
৫৬. তোমার গোপাল – এই ভাব ঠিক থাকিলেই, তোমার সব হইয়া গেল । আর কোন কিছুরই দরকার নাই তোমার । পুতনার মোক্ষলাভের কথা মনে কর । যার অপার-করুণায় বিষের পরিবর্ত্তে অমৃত পাইল । পুতনার রাক্ষসের জন্ম ঘুচিয়া গেল । গোবিন্দের আনন্দময় শরীর পাইয়া তাহার নিজধামে স্থানলাভ হইল ।
৫৭. তোমাদের হিতচেষ্টা আমার জীবনব্রত । তোমরা আমাকে ভালবাসিয়া স্নেহ করিয়া গোপালভাব লইয়া ভাল ভাল জিনিষ যখনকার যা সব কিছু সেবা দিচ্ছ । তোমাদের ভাগ্যর ও সীমাই আমি পাইনা । কোন পরম শান্তির লোকে ভগবানের কাছে অবাধে যাইবে । ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।
৫৮. ভক্তের অভীষ্ট সিদ্ধি কল্পে ভগবান সততই কল্যাণ কামনা করিয়া থাকেন । সাধুর ইচ্ছা অবশ্যই পূর্ণ হয় । কারণ এই ইচ্ছা যে ইচ্ছাময়ের ইচ্ছা । এই ইচ্ছার গতি ফিরায় কে ?
৫৯. শ্রীগুরু দেহতরীর কাণ্ডারী । জ্ঞান-মাঝি শক্ত করিয়া হাল ধরিয়া আছেন । কি করে তরী ডুববে ? হোক না সংসার সাগর । আসুক না তুফান ভারি । জ্ঞান-মাঝির নৌকা জলে ভাসে, দোলে ডোবে না । সংসারের মায়াজাল, হাসি-কান্নার তুফানে এ জড়দেহ দোলাইবে তাতে ক্ষতি কি ? সেই সচ্চিদানন্দ তুমি – তোমার ধ্বংস কোথায় ? তুমি সৎ – তুমি চিরকাল থাকবে । দেহ অসৎ তাই ক্ষণস্থায়ী । সৎ যাহা তাহা গ্রহণ কর – অসৎকে বর্জন কর ।তুমি সৎ – তোমার শান্তি শান্তি অশান্তি কি ? এই মরদেহেরই শাস্তি জরা-ব্যাধি ।
৬০. শান্তি-অশান্তি-জরা-ব্যাধি এই সব চিন্তা অনুক্ষণ কর বলেই, ক্ষণস্থায়ী বস্তুতে আসক্তি থাকিলেই নানা প্রাকার ভয় উদ্বেগ হইয়া থাকে । সৎ কার্যে, সৎ বস্তুতে আসক্তি রাখ – তাহাতে ডর ভয় নাই । মনে মনে বলবে আমি সৎ কার্য করিয়াছি – আমার আবার ডর ভয় কি ? সচ্চিদানন্দের ধ্যান ধারণা ছাড়া শান্তি কোথায় ? সচ্চিদানন্দের পূজা-অর্চ্চনাই জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য । তা হইলে কোন অবস্থাতেই দুঃখ কষ্ট হইবে না । সংসারে থাকিয়া নির্লিপ্তভাবে গুরু সচ্চিদানন্দকে পাইতে হইবে । তবেই জীবন চিরসুখের । সংসারের হাসি-কান্নায় ক্লেশ পাইতে হইবে না ।
৬১. ‘গুরু’ পাঞ্জাব মেইল । সেই মেইলে নাম – টিকেট কাটাইয়া উঠিয়াছ । এখন তাস-পাশা খেলে যাও বা ঘুমাইয়া বসিয়াই যাও পাঞ্জাব পৌঁছিতে হইবেই । এই হল গিয়ে সৎ গুরুর ব্যাপার । তবে আর চিন্তা কি ? আনন্দম্‌, আনন্দম্‌, আনন্দম্‌ । আমিইত সব করে নিব । ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।
৬২. রাখে কৃষ্ণ মারে কে ? কে বুঝিবে তোমার লীলা – জলেতে ভাসাও শীলা – কর ঘোড়া – গাধা পিটায়ে । কাঠ-বিড়ালী সাগর বাধে ডুবে অতল জলাশয়ে ! বিধাতার বিচিত্র লীলা ।
৬৩. জয় ব্রজানন্দ হরে । নাম তরোয়াল হাতে নিয়ে বসে থাক । বিপদ-আপদ কিছুই থাকবে না ।
৬৪. পুতনা কৃষ্ণের ধাইমা হইয়া মোক্ষপ্রাপ্ত হইল । আমার মাঈরা মায়ার বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করিবে । ভরসা রাখ, নির্ভয় নিশ্চিন্ত হও ।
৬৫. আমার বাক্য অমোঘ । একবার যে বাক বাহির হয় – তা আর ফিরে না । সাধুকাবাত – হাতীকা দাঁত । হাতীর দাঁত বাহির হইলে আর ফিরে না । তেমনি সাধুর জীব-কল্যাণ বাক্য অমোঘ । আমার শতং জীব এই বাক্য অমোঘ । আমার সর্বরোগারোগ্যম্‌ আশীর্বাদ অমোঘ ।
৬৬. অসুখ-বিসুখ কি করিতে পারে ? দেহ ঘরের খুটি শক্ত করিয়া লও । ঝড় তুফানে কিছু করিতে পারিবে না । নাম তরোয়াল হাতে রাখ ।
৬৭. ভগবানে ও তাঁর অবতারে বিশ্বাস মহাভাগ্য শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত । উদ্ধার অবশ্যম্ভাবী ।
৬৮. আমার ভক্ত আমার সুশীতল শান্তিময় কোলে স্থানলাভ করে । আমার সত্যবাণী ।
৬৯. কৃপার অধিকারী না হইলে দর্শনলাভ হয় না । কৃপা না ইহলে আমার দর্শন দিবার শক্তি নাই ।
৭০. প্রণব চিন্তন বা ধ্যান গুরুমূর্ত্তির পৃথক বোধ করিও না । অর্থাৎ আমি এক – প্রণবাদি গুরুমূর্ত্তি আর এইরূপ দ্বৈতভাব নিয়া উপাসনা করিও না । আমি এবং আমার উপাস্য অভেদ – এই ভাব ধারণ করিয়া লও । তুমি এবং তোমার উপাস্য এক না হলে – উপাস্যে মিশিয়া একাকার হইবে কেমনে ? নানা নাম আর রূপ সকল তোমাতে কল্পিত । নাম রূপ উপাধি সকল পরিত্যাগ করিয়া – সারবস্তু তোমার আত্মা পরমাত্মা স্বরূপ জানিয়া ধ্যান কর – তাহার নানা নাম নানারূপ শব্দ লইয়া বৃথা অশান্তি ভোগ করিওনা । গুরুকে অকার জানিবে অর্থাৎ অশরীরী, কায়া-রহিত বোধে ভজন করিও । আমার ভক্তের আমার মূর্ত্তির জন্য ভাবনা কি ?
৭১. মন খোলা – হাত খোলা – আমার প্রকৃত রূপ ।
৭২. সার্বভৌম দেবালয় – জগৎ জোড়া । ব্রজানন্দ নব যুগের নব অবতার । ভক্ত সার্বভৌম ধর্ম প্রতিষ্ঠার ভাব পায় । সর্বধর্ম সমন্বয়ে কলির যুগধর্ম ।
৭৩. গুরু যদি সহায় থাকে – প্রসন্ন হয় – হাজার মাইল দূর থেকেই শুভ করতে পারে ।
৭৪. আমি কুয়া খুদিনা – আমার ভক্ত পাতালে যাবে না । আমি মঠ তুলি – আমার ভক্ত ব্রহ্মলোকে যাবে ।
৭৫. ভক্তের শক্তি না পেলে – ভগবান শক্তি কোথায় পাবে ? ভক্তের শক্তিতেই ভগবান বলীয়ান । ভক্তই ভগবানকে গড়ে তোলে ।
৭৬. ব্রজানন্দ সর্বত্রই বিদ্যামান । হাম্‌ যো তুম সো – সর্বত্রই রাম । যাহা যাহা আঁখি কোরে তাহা তাহা কৃষ্ণ স্ফুরে । যে দিকেই আঁখি যায় – সে দিকেই কৃষ্ণ ।
৭৭. গুরু দেন বৈরাগ্য-মন ভোগের দিকে । তার হলনা । গুরু দেন ছেড়া কাঁথা আর রুটি – মন ভোগের দিকে । তার হল না । কবে মোরে নিতাইচাঁদ করুণা করিবে – সংসার বাসনা মোর কবে তুচ্ছ হবে । এই ভাব ধর ।
৭৮. গুরু ভিন্ন আমার গতি নাই । তাই গুরুর চরণে সব সমর্পণ করে বসে আছি । একান্ত শরণ ।
৭৯. তস্মিন্‌ তুষ্টে জগৎ তুষ্ট । তুমি সুখময় তুমি সুখে থাক । এইই ভক্তের কথা ।
৮০. ভক্তি নিষ্ঠা চাই । সাত খানে কুয়া খুদলে কি হবে ? সাত খানে কুয়া খুদ্‌লে কি আর জল পাওয়া যায় ? বিশ্বাসে ফল পায় । ছুটাছুটি করলে কি হবে ? ভক্তি আনতে হবে – ভগবৎ বুদ্ধি আনতে হবে । পুরোপুরি বিশ্বাস চাই ।
৮১. যিনি ব্যাধি দিয়েছেন – তিনিই ব্যাধি হরণ করতে পারেন । ডাক্তার কবিরাজ কি করবে । ভাব নিয়ে ভাবতে হবে – তবে ত ফল হবে । ভাব ভক্তি চাই ।
৮২. চাহনির শেষ কর । চাহনি শেষ হলেই পাইয়া যাইবা । চাহনির শেষ কর ।
৮৩.

আর্শীব্বাণী
গুরুধাম
বাঙ্গুর এভিনিউ,দমদম ।

নানা বাধাবিঘ্নের মধ্যে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বিগত ১৯শে জুন, ১৯৭১ সন, শনিবার ঢাকা থেকে কলিকাতায় পৌঁছেছি । অনেক দিনের ব্যবধানের পর ভক্তশিষ্যগণের মধ্যে এখানে ফিরে আসতে পেরে ভাল লাগছে ।

চারিদিকে শুনি আনন্দের জয়ধ্বনি । তবু কেন মনে আমার বিষাদের সুর বাজে ? পূর্ববঙ্গে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে ঢাকাস্থিত বুড়াশিবধাম সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং শ্রীধামে অবস্থানরত পাঁচজন সাধু প্রাণ হারিয়েছেন । আজীবন ত্যাগ ও সাধনায় গড়া আমার সাধের স্বর্গপুরী বুড়াশিবধাম ও তার অধীশ্বর বুড়াশিব বর্ত্তমান বৈপরীত্যে বিধ্বস্ত ।

এখন আমি তোমাদের দুয়ারে একজন শরণার্থী । তোমাদের সেবা পূজা পাওয়ার জন্য আমার মন সর্বদা অধীর হয়ে আছে । তোমাদের মনে আমি যেন একটু স্থান পাই ।

আর্শীবাদের জন্য লেখনির প্রয়োজন হয় না । আর্শীবাদ আমার অন্তর হতে অবিরাম দশ দিকে অবিশ্রান্ত গতিতে ছুটে যাচ্ছে । যে কাজ করবে, সে-ই আর্শীবাদ অনুভব করতে পারবে এবং সেই আশীর্বাদকে সফল করে নিজের জীবনে প্রস্ফূটিত করতে সমর্থ হবে ।

শুভ গুরু পূর্ণিমা তিথিতে গুরুধামের ধর্ম্মীয় মুখপত্র “গুরুধাম” পঞ্চম সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে ভক্তশিষ্যগণের বিভিন্ন রচনা নিয়ে । আমি আর্শীবাদ করি ভক্তশিষ্যগণের এই প্রচেষ্টা সফল হউক এবং “গুরুধাম” দীর্ঘজীবী হয়ে ভক্তশিষ্যগণকে ব্রজানন্দধর্ম সাধনায় উদ্বুদ্ধ করুক ।

             ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি । জয় ব্রজানন্দ হরে ।

গুরুপূর্ণিমা
১৩৭৮ সন
আর্শীবাদক
শ্রীশ্রী স্বামী ব্রজানন্দ সরস্বতী
৮৪. প্রাতঃকালে শিবং দৃষ্টা নিশিপাপং ন বিদ্যতে । মধ্যাহ্নে আজন্মকৃতং পাপং সায়াহ্নে সপ্ত জন্মনয় ।
৮৫. প্রতিমায় শীলা বুদ্ধি – মন্ত্রেতে অক্ষর বোধ – গুরুতে মানুষ বুদ্ধি । নরকে যাবার পথ ।
৮৬. সৎ কর্মের প্রভাবে সঞ্চিত প্রারব্ধের অল্পাধিক লাঘব হয় । যেমন দশ বৎসরের কয়েদী দশ বৎসর কারাবাসের পূর্বেও মুক্তি পায় । ক্রিয়মান প্রারব্ধের লাঘব হয় না । যেমন ধনুক হইতে তীর একবার ছাড়িয়া ফেরান যায় না ।
৮৭. গুরু সহায় থাকিলে – আগুনে পুড়বে না – জলে ডুববে না – ছাই মুঠ করলে সোনা হবে ।
৮৮. নাম নৌকা – নদী পার করে – ভবসাগর পার করে ।
৮৯. শ্রীদেহের কুশল জিজ্ঞাসার উত্তরে – ক্ষণে রুষ্ট ক্ষণে তুষ্ট – রুষ্ট তুষ্ট ক্ষণৈঃ ক্ষণৈ ।
৯০. কৃপালাভ করতে হলে – নাম করতে হয় – জয়গুরু-জয়গুরু ।আল্লা হরি করলে হবে না । হয় আল্লা না হয় হরি – এক আশ্রয়ে থাক ।
৯১. গোচনায় নারায়ণ শুদ্ধ হয় । দানপুণ্যে মনের ময়লা দূর হয় – দেহের পাপ ক্ষয় হয় ।
৯২. সাধুর দশজনের সঙ্গে কারবার সকলের সঙ্গে এক রকম ব্যবহার । তা না হলে কেমন সাধু ?
৯৩. মেয়েদের কাজ সংসার দেখা – চাকুরী করা ভাল না – প্রজনন শক্তি নাশ হয় । জনসংখ্যা বৃদ্ধি কোন সমস্যাই না ।
৯৪. পাশ্চাত্য আদর্শে স্ত্রী-শিক্ষার প্রসার-বিষয়াভিমুখী বুদ্ধিদ্বারা পরিচালিত – অর্থোপার্জনে লক্ষ্য । ফলে সংসারের কাজে উদাসীন সংসারে বিশৃংখলা ।
৯৫. গুরুকে সব সমর্পণ করতে হয় – শরণাগত হইতে হয় – গুরুর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয় । তবেই গুরু রক্ষা করেন । স্ত্রীর যেমন স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয় – তবেই স্বামী ভালবাসে । সংসার দিয়াই ভগবৎ রাজ্যের পরিচয় পাওয়া যায় ।
৯৬. ভজ ভজ ভজ ভাই শ্রীগুরুর চরণ – মদ মোহ ছাড়ি লও শ্রীগুরুর শরণ । একান্তশরণ – একান্ত শরণ লও । সব সহজ হয়ে যাবে । শ্রীগুরুর চরণে শরণ লও সহজ হয়ে যাবে ।
৯৭. কর্তা সাজবে না – কর্তা হওয়া বড় কঠিন – সোজা না । কর্তার সব দিকে দৃষ্টি রাখতে হয় – পারবেলা কাণ্ডারি কর তাঁহারে তোমার সব সহজ হয়ে যাবে ।
৯৮. ভগবানকে কি করে জানবে ? ভগবানকে জানতে হলে – চেষ্টা করতে হয় – সাধনা করতে হয় । ‘সর্ব ধর্মাণং পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’ এর মর্ম উপলব্ধি করতেই সারা জীবন যায় কেটে । সারা জীবন চিন্তা করনা কি খাব – কি খাব ? ভগবানকে জানবে কি করে ?
৯৯. গুরুদত্ত কন্ঠী বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে । ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে ধারণ করবে । কন্ঠী বডি গার্ড ।
১০০. সংসার সমুদ্র – কেবলই তরঙ্গ – কেবলই তরঙ্গ । সারা জীবন খাটনী খেটে – একটার পর একটা আছেই আছে । ভূতের কাছে ছুটা ছুটী । গুটান যায় না । ছেলে নাই – ঠাকুর দেবতার কাছে মানত করে । ছেলে হইলে চিন্তা ছেলে বাঁচবেত ? ঠাকুর দেবতার কাছে মানত করে । ছেলে বড় হইল – চিন্তা ছেলে মানুষ হবেত ? পর পর ছেলে পরীক্ষা পাশ করবেত – ভাল চাকরী হবেত – মনের মত পুত্রবধু হবে কি ? একের পর আর শেষ নাই । ভূতের সাথে দৌড়া দৌড়ি । সংসার কেউ গুটাতে পারে না । সংসার সমুদ্র – দশ কলসি ঢাল আর তোল – সমান ।
১০১. দিন নাই ক্ষণ নাই । যার ঘরে গুরু বিরাজ করেন তার সকল তিথিই সকল বারই শুভ । যার ঘরে গুরু বিরাজ করেন না – তার সকল তিথিই সকল অশুভ ।
১০২. বিশ্বাসে সব হয় । আমি তুলসী চন্দন শালগ্রাম শীলা চরণে লই – আমার পুরোপুরি বিশ্বাস – আমি সেই । যার এই বিশ্বাস নাই সে ভষ্ম হয়ে যাবে । নজরের ভয়ে সবাই নিভৃতে সেবা গ্রহণ করে । আমি হাজার হাজার চোখের সামনে বসে সেবা লই । আমার একটুও নজরের ভয় নাই । আমার পুরাপুরি বিশ্বাস আমি সেই ।
১০৩. লাভ লোকসান আসলে সমান । ভাঙ্গা গড়া সংসারের নিয়ম । গুরু সহায় থাকলে – আর একখানা দিয়ে দেয় । একখানা দিয়ে গেলে – গুরু আর একখানা দিয়ে দেয় ।
১০৪. আমাকে যে চায় – আমাকে সে পায় । বিশ্বাসে মিলায় কৃষ্ণ । প্রহ্লাদের বিশ্বাস আমার হরি থামের ভিতর । ভক্ত হনুমান জয় রাম বলে সাগর পার হয়ে গেল । মারিচ রাম রাম করতে করতে রাম হয়ে গেল । ভক্তি বিশ্বাসে সব হয় ।
১০৫. তুমি শুধু আমার চিন্তা কর । আমি সকলের চিন্তা করি । আমি স্থানান্তরে গিয়েও – সব সময় ভাবি কে কেমন আছে ।
১০৬. ব্রজানন্দ বায়ু । তার গতি কে রোধ করে ? স্মরণ মাত্র আমি তোমার অন্তরে বিরাজ করি । ঝড় তুফানে আমার গতিরোধ করতে পারবে না ।